দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রগুলো দ্রুত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। এই কৌশলে তারা এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছ থেকে ২০২৫ সালে কমপক্ষে ৮৮০০ কোটি ডলার প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) বলেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এড়িয়ে যেতে অপরাধচক্রগুলো দ্রুত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। তারা আয়ের নতুন উৎস তৈরি করছে।
দুর্নীতিকে কাজে লাগাচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে প্রতারণার কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৮৩১.১৪ কোটি ডলারের মধ্যে। এই অঙ্ক অঞ্চলটির কয়েকটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়েও বেশি।
ইউএনওডিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি ডেলফিন শান্টজ বলেন, আগে নির্দিষ্ট এলাকা বা নির্দিষ্ট অবৈধ ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকা অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো এখন একাধিক অবৈধ খাতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরস্পর সংযুক্ত সেবাভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করছে। তার ভাষায়, তাদের কার্যক্রম অনেকটা করপোরেট ফ্র্যাঞ্চাইজির মতো। অর্থ পাচার, মানবপাচার, অভিবাসী পাচার এবং তথ্য চুরির জন্য আলাদা আলাদা বিশেষায়িত বিভাগ থাকলেও, সবগুলো একই আন্তঃসংযুক্ত সেবাভিত্তিক নেটওয়ার্কের অংশ।
সাইবার প্রতারণার কেন্দ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রতারণাকেন্দ্র থেকে পরিচালিত অনলাইন জালিয়াতির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড থেকে বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে অপরাধচক্রগুলো। এসব প্রতারণাকেন্দ্রের অনেকটাতেই মানবপাচারের শিকার বিদেশি নাগরিকদের জোরপূর্বক আটকে রেখে কাজ করানো হয়। ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের প্রতারণাকেন্দ্রগুলোতে অন্তত ৮০টি দেশ ও অঞ্চলের নাগরিককে শনাক্ত করা হয়েছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন ট্রানজিট কেন্দ্র ব্যবহার করে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়।
এশিয়ার বাইরেও কর্মী নিয়োগ
প্রতিবেদন বলছে, নতুন বাজারে প্রবেশের লক্ষ্য নিয়ে প্রতারক চক্রগুলো এখন এশিয়ার বাইরেও কর্মী নিয়োগ করছে। জার্মান, পোলিশ, ডাচ, স্প্যানিশ, ইতালীয়, ফরাসি, সুইডিশ, নরওয়েজিয়ান এবং ইংরেজি ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে নিয়োগ বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে কিছু এলাকায় তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হলেও পুরো নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়নি। ইউএনওডিসি জানিয়েছে, মিয়ানমার ও লাওসের মতো দেশ থেকে সরে গিয়ে এসব অপরাধচক্র এখন পূর্ব তিমুর, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ঘাঁটি গড়ে তুলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও শিথিল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন দেশ খুঁজে নিয়ে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র। এই প্রবণতাকে তারা ‘জুরিসডিকশন শপিং’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইউএনওডিসির মতে, প্রযুক্তিনির্ভর সংঘবদ্ধ অপরাধ বিস্তারে দুর্নীতিই সবচেয়ে বড় সহায়ক। এআই ব্যবহারে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে প্রতারণা। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, অপরাধীরা শুধু জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরিই করছে না; ভবিষ্যতে তারা এজেন্টিক এআই ব্যবহার করে আরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতারণা পরিচালনা করতে পারে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভাব্য শিকার শনাক্ত করা, সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক (সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) প্রতারণা চালানো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি ও অর্থ পাচারের মতো অপরাধ আরও সহজ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, প্রতারণা শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে অর্থ পাচার, আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যাংকিং এবং চুরি করা তথ্য কেনাবেচার মতো সহযোগী অপরাধমূলক সেবারও বিস্তার ঘটছে।
ইউএনওডিসির প্রধান বিশ্লেষক ইনশিক সিম বলেন, সংঘবদ্ধ অপরাধভিত্তিক এই অর্থনীতির ব্যাপ্তি ও জটিলতা এত দ্রুত বাড়ছে যে, বিদ্যমান প্রতিরোধব্যবস্থা এ ধরনের উচ্চমাত্রার সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
