ফিলিস্তিনি যোদ্ধা গোষ্ঠী হামাসের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খলিল আল-হাইয়ার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে কাতারে ইসরাইলের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এই জ্যেষ্ঠ হামাস নেতা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত। গাজার চলমান যুদ্ধে তিনি এক ছেলেকে হারিয়েছেন।
এর আগের যুদ্ধগুলোতেও তার আরও দুই ছেলে নিহত হন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইসরাইলি হামলায় হামাসের একের পর এক শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ার পর সংগঠনের ভেতরে আল-হাইয়ার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। নিহতদের মধ্যে আছেন ইসমাইল হানিয়া এবং ইয়াহিয়া সিনওয়ার।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের অভিযানের পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধজুড়ে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আল-হাইয়া। তিনি ইসরাইলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেন। ফল হিসেবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। ওই চুক্তির ফলে গাজায় বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ হলেও, ইসরাইল হামাস ও নিজেদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি বলে দাবি করা অন্যান্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইরান সফরের সময় ইসমাইল হানিয়া নিহত হওয়ার পর থেকে আল-হাইয়াকে বিদেশে অবস্থানকারী হামাস নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দোহায় হামাস নেতাদের ওপর ইসরাইলের হামলার সময়ও তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর কাতারভিত্তিক পাঁচ সদস্যের নেতৃত্ব পরিষদ হামাস পরিচালনা করে আসছিল। আল-হাইয়া ছিলেন সেই পরিষদের অন্যতম সদস্য।
হামাসে দীর্ঘ পথচলা
গাজা উপত্যকায় জন্ম নেয়া ৬৪ বছর বয়সী আল-হাইয়া হামাসের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত। হামাস সূত্রের মতে, ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগ দেন। একই সময়ে ইসমাইল হানিয়া ও ইয়াহিয়া সিনওয়ারও ওই সংগঠনে যুক্ত হন। পরে ১৯৮৭ সালে হামাস প্রতিষ্ঠিত হলে শুরু থেকেই তিনি সংগঠনটির সদস্য ছিলেন। গাজায় অবস্থানকালে ইসরাইল তাকে একাধিকবার আটক করে। ২০০৭ সালে গাজা সিটির শেজাইয়া এলাকায় আল-হাইয়ার পারিবারিক বাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন।
২০০৮ সালে আরেকটি বিমান হামলায় তার ছেলে হামজা নিহত হন। ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধে তার বড় ছেলে ওসামার বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ওসামা, তার স্ত্রী এবং তাদের তিন সন্তান নিহত হন। চলমান গাজা যুদ্ধেও আল-হাইয়া তার আরেক ছেলেকে হারিয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
কয়েক বছর আগে আল-হাইয়া গাজা ছেড়ে কাতারে চলে যান। এরপর থেকে আরব ও ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে হামাসের সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইসমাইল হানিয়ার সঙ্গে তিনি তেহরান সফরে যান। সেই সফরেই হানিয়া নিহত হন। আল-হাইয়া একবার বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের অভিযান মূলত কয়েকজন ইসরাইলি সেনাকে আটক করে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময়ে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল। তার ভাষায়, কিন্তু জায়নবাদী সেনা ইউনিট পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। তিনি আরও বলেন, ওই অভিযানের ফলে ফিলিস্তিন ইস্যু আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
যুদ্ধবিরতি আলোচনার পাশাপাশি হামাসের বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগেও নেতৃত্ব দিয়েছেন আল-হাইয়া। ২০২২ সালে তিনি একটি হামাস প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক সফর করেন। ওই সফরের উদ্দেশ্য ছিল সাবেক সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় আসাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতি হামাস সমর্থন জানানোয় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই পক্ষের সম্পর্কের অবনতি হয়। পরে সেই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালানো হয়। ইরান, সিরিয়া ও হামাসকে ঘিরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক জোটকে শক্তিশালী করতেও এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
