সুইজারল্যান্ডে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বদল মানে বাজারে শিরশিরে বাতাস বয়ে যাওয়া নয়। সেখানে গভর্নর নিয়োগ হয় দীর্ঘ মেয়াদের জন্য, স্পষ্ট আইন ও প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এবং অপসারণ প্রায় অকল্পনীয়, যদি না গুরুতর কোনো নৈতিক বা আইনি অপরাধ ঘটে। ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোতেও একই চিত্র। জার্মানির বুন্ডেসব্যাংক কিংবা ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গভর্নর বা প্রেসিডেন্ট বদল মানে আগাম ঘোষণা, ব্যাখ্যা ও একটি মসৃণ রূপান্তর। এশিয়াতেও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব পরিবর্তন বাজারের জন্য “সংবাদ” হতে পারে, কিন্তু “শক” নয়। কারণ সেখানে চেয়ারটি ব্যক্তির চেয়ে বড় এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের আকস্মিক অপসারণ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি ভিন্ন বার্তা দেয়। বার্তাটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা এবং সাধারণ আমানতকারীদের কাছেও স্পষ্টভাবে পৌঁছেছে বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব এখনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঝাঁকুনির বাইরে নয়। যখন বিশ্ব অর্থনীতি সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় টালমাটাল, তখন একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত স্থিরতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা, সেই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠছে।
ইউরোপের অভিজ্ঞতা বলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শুধু আইনের পাতায় থাকলেই হয় না; তা বাস্তব আচরণেও প্রতিফলিত হতে হয়। জার্মানিতে বুন্ডেসব্যাংক প্রেসিডেন্ট একাধিকবার সরকারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন তবু তার চেয়ার নড়েনি। জাপানে ব্যাংক অব জাপানের গভর্নরকে পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতে হয়, যাতে তিনি একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল না হন। সিঙ্গাপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এমনভাবে নিয়োগ পান, যাতে ব্যবসা-রাজনীতি-রাষ্ট্র এই তিন পক্ষের ভারসাম্য বজায় থাকে। এসব উদাহরণের সারকথা একটাই: কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশ্বাসযোগ্য হতে হলে তার নেতৃত্বকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হতে হয়।
বাংলাদেশে ড. মনসুরের সময় নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু এটাও সত্য, তার মেয়াদে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের রোগগুলো আড়াল থেকে আলোচনার টেবিলে এসেছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি আচরণ, বছরের পর বছর পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি, এভারগ্রিনিংয়ের মাধ্যমে হিসাব ‘সুন্দর’ রাখার প্রবণতা এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ আর ছিল না। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকেই শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে বড় ঋণের ক্ষেত্রে অনাদায়ী ঋণের উচ্চ হার প্রমাণ করে, সমস্যার মূল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নন; বরং ক্ষমতাবান বড় খেলাপিরাই।
গত আঠারো মাসে ব্যাংকিং খাতে কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগও দেখা গেছে। দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার আলোচনা, সম্পদের প্রকৃত মান যাচাইয়ের চেষ্টা, বিনিময় হার ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন এসব ছিল দীর্ঘদিনের স্থবিরতায় প্রথম নড়াচড়া। এগুলো নিখুঁত ছিল না, ফলও তৎক্ষণাৎ আসেনি। কিন্তু দিকনির্দেশনা ছিল ব্যাংকিং খাতের দৈন্যতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি প্রাথমিক মানচিত্র।
ঠিক এই সময়েই হঠাৎ গভর্নর পরিবর্তন সেই মানচিত্রকে ঝাপসা করে দেয়। মনে হয়, সংস্কার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার নয়; এটি ব্যক্তিনির্ভর। আজ একজন গভর্নর সংস্কারের প্রতীক, কাল তিনি অপসারিত এই বার্তা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। নতুন গভর্নর হিসেবে একজন শিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেয়ায় দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা নীতিতে বাস্তববোধ আনতে পারে এটা ইতিবাচক। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন জায়গা, যেখানে স্বার্থের সংঘাতের সামান্য সন্দেহও বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইউরোপ ও এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে এ কারণেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষে বসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা দেখা যায়। নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক হিসেবে হয়তো তাৎক্ষণিক চাপ সামাল দেয়ার প্রয়াস। কিন্তু অর্থনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত মানে কেবল আজকের উত্তেজনা কমানো নয়; আগামী কয়েক বছর আস্থা তৈরি করা। আস্থা আসে নিয়ম, ব্যাখ্যা ও ধারাবাহিকতা থেকে। যদি কোনো গভর্নরের নেতৃত্বে সমস্যা থাকে, উন্নত বিশ্ব যেভাবে করে কারণভিত্তিক, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন সেটাই বাজারের কাছে গ্রহণযোগ্য।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দৈন্যতা কাটাতে মূল চ্যালেঞ্জগুলো এখনো একই রয়ে গেছে। বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা, তদারকিতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বকে এমন সুরক্ষা দেয়া যাতে তিনি প্রয়োজনে সরকারকেও “না” বলতে পারেন। সুইস ঘড়ির মতো নির্ভুলতা হয়তো একদিনে আসবে না। কিন্তু অন্তত সেই মানসিকতা যেখানে চেয়ার ব্যক্তির চেয়ে বড় সেটা গ্রহণ না করলে ব্যাংকিং খাতের অসুস্থতা দীর্ঘস্থায়ীই থাকবে।
আজকে প্রশ্নটা তাই ড. মনসুর বা মোস্তাকুর রহমান কে ভালো সেটা নয়। প্রশ্নটা হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ নেবে, যেখানে গভর্নর বদল হবে নিয়মে, ব্যাখ্যায়, মর্যাদায়, না কি ঘটনার চাপে, হঠকারী সিদ্ধান্তে গুঞ্জনে না অপরিণামদর্শিতায়।
ড. আহসান এইচ মনসুরের অপসারণ ব্যক্তিগত ঘটনার চেয়ে বড় একটি প্রশ্ন রেখে যায়। বাংলাদেশ কি প্রাতিষ্ঠানিক পথে হাঁটবে যেখানে গভর্নর বদল হবে নিয়মে ও মর্যাদায় নাকি আমরা হঠাৎ সিদ্ধান্তের ঝাঁকুনিতেই অভ্যস্ত থাকবো? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভবিষ্যতে সুইস ঘড়ির মতো স্থির হবে, না কি বারবার সময় হারাবে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
