শিরোপা জয়ের পর গোলপোস্টের জাল কাটা হয় কেনো?

ফন্ট সাইজ:

আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন। এদিন শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার পর বিজয়ী দলের খেলোয়াড়রা গোলপোস্টের জালের অংশ কেটে নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করেন। প্রথম দেখায় এটি অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে ক্রীড়াঙ্গনে এটি বহু বছরের একটি ঐতিহ্য। যা জড়িয়ে আছে স্মৃতি, আবেগ ও ইতিহাসের সঙ্গে। ২০২১ সালে মারাকানায় কোপা আমেরিকা ফাইনাল ম্যাচে ব্রাজিলকে এক শূন্য গোলে হারানোর পরেও দেখা গেছে গোলপোস্টের জাল কেটে নিয়ে গেছেন ফাইনালের একমাত্র গোলদাতা, জয়ের নায়ক অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া।

গোলপোস্টের জাল কাটার ইতিহাস নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও, ক্রীড়া ইতিহাসবিদদের মতে এর জনপ্রিয়তা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ বাস্কেটবল থেকে। ১৯৪০-এর দশকে এনসিএএ টুর্নামেন্টে শিরোপা জয়ের পর খেলোয়াড় ও কোচরা বাস্কেটবল রিংয়ের জাল কেটে স্মারক হিসেবে রাখতেন। ধীরে ধীরে এটি কলেজ ক্রীড়ার অন্যতম পরিচিত বিজয় উদ্যাপনে পরিণত হয়। পরবর্তীতে এই সংস্কৃতি ফুটবলসহ অন্যান্য খেলাতেও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট বা ঐতিহাসিক কোনো শিরোপা জয়ের পর গোলপোস্টের জালের একটি অংশ সংরক্ষণের প্রবণতা দেখা যায়।

গোলপোস্টের জাল কাটা কোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। অনেক টুর্নামেন্টে নিরাপত্তা ও স্মারক সংরক্ষণের কারণে ম্যাচ শেষে আয়োজকরাই জাল খুলে রাখেন। আবার কোথাও খেলোয়াড়দের জাল কাটার অনুমতি দেয়া হয়, কোথাও দেয়া হয় না। অর্থাৎ এটি পুরোপুরি আয়োজক ও প্রতিযোগিতার নীতির ওপর নির্ভর করে।

একটি ফুটবল ম্যাচের বল, জার্সি বা পদক যেমন স্মৃতির অংশ। তেমনি গোলপোস্টের জালও বিজয়ের নীরব সাক্ষী। পুরো ম্যাচজুড়ে প্রতিটি গোল, প্রতিটি উল্লাস এবং শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার মুহূর্তের সঙ্গে এই জাল জড়িয়ে থাকে। অনেক খেলোয়াড় সেই জালের টুকরো বাড়িতে সংরক্ষণ করেন। কেউ সেটি ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখেন, আবার অনেকে পরিবারের সদস্যদের উপহার দেন। অনেক কোচও দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্যের স্মারক হিসেবে এটি সংগ্রহ করে রাখেন।

ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন ক্লাব প্রতিযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ফুটবল এবং কিছু আন্তর্জাতিক আসরে শিরোপা জয়ের পর খেলোয়াড়দের জালের অংশ সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। অনেক সময় পুরো জালই খুলে নেয়া হয়। ক্লাব বা আয়োজক সংস্থা পরে সেটি ছোট ছোট অংশে ভাগ করে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ কিংবা জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য দেয়।

ফুটবলে এই ঐতিহ্যের চল শুরু হয় মূলত স্প্যানিশ ডিফেন্ডার জেরার্ড পিকের হাত ধরে। তিনি একাধিক বড় শিরোপা (চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বিশ্বকাপ) জয়ের পর মাঠে ফিরে গোলপোস্টের জাল কেটে স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করতেন। পরবর্তীতে তার এই উদ্যাপন রীতিটি বিশ্বজুড়ে ফুটবলারদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি বড় কোনো ফাইনাল শেষে অনেক খেলোয়াড় জালের অংশ কেটে নিজেদের কাছে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেও সংরক্ষণ করেন।

আধুনিক খেলাধুলায় প্রতিটি মুহূর্তই ক্যামেরায় বন্দী হয়। ট্রফি, পদক, ছবি সবই থেকে যায়। তবুও অনেক খেলোয়াড়ের কাছে গোলপোস্টের জালের একটি ছোট্ট অংশের মূল্য আলাদা। কারণ এটি কেনা যায় না, তৈরি করা যায় না; এটি কেবল সেই ম্যাচের, সেই বিজয়ের এবং সেই ইতিহাসের অংশ। তাই শিরোপা জয়ের পর খেলোয়াড়দের হাতে যখন কাঁচি দেখা যায়, তখন সেটি শুধু একটি জাল কাটার দৃশ্য নয়। সেটি আসলে একটি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা, একটি স্বপ্নপূরণের মুহূর্তকে নিজের করে রাখার চেষ্টা এবং ক্রীড়া ইতিহাসের একটি আবেগঘন অধ্যায়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন