ভূরাজনীতিকে হারিয়ে জিতেছে ফুটবল

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের নিবন্ধ

ভূরাজনীতিকে হারিয়ে জিতেছে ফুটবল

ফন্ট সাইজ:

যে বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ এমন এক রাষ্ট্র, যার সঙ্গে অংশগ্রহণকারী একটি দেশের যুদ্ধাবস্থা চলছে, যে সময় বিশ্বজুড়ে বিভাজন ও মেরুকরণ চরমে- সেই বিশ্বকাপের সমাপ্তি হলো উষ্ণতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের আবহে। এ যেন ভূরাজনীতির ওপর ফুটবলের নীরব কিন্তু শক্তিশালী জয়। ফাইনালে স্পেনের অসাধারণ কৌশলগত ফুটবল লিওনেল মেসিকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেয় এবং আর্জেন্টিনাকে আরেকটি নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দেয়নি। ম্যাচটি একতরফা হলেও ছিল লড়াইপূর্ণ। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের তারকাদের আচরণে ছিল না কোনো তিক্ততা। 

মাঠে নামার আগে টানেলে অপেক্ষার সময় মেসি নিজেই এগিয়ে গিয়ে স্পেনের খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করেন। ম্যাচ শেষে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি করেন লামিন ইয়ামাল। তিনি মেসির কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন, পিঠে হাত বুলিয়ে সম্মান ও সমবেদনা জানান। বার্সেলোনার এক কিংবদন্তি এবং আরেক সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কিংবদন্তির সেই মুহূর্ত যেন হাজারো শব্দের চেয়েও বেশি অর্থ বহন করছিল। সেটিই ছিল ফুটবলের প্রকৃত পরিচয়। 

বিশ্বকাপজুড়ে নানা অ-ক্রীড়া ইস্যু আলোচনায় এসেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটি ফুটবলের আলোকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক ভিসানীতি, স্বাগতিক দেশের এক ফুটবলারের লাল কার্ড বাতিলের ঘটনাকে ঘিরে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে নিয়ে বিতর্ক কিংবা ইরানের পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ- সবই শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসে ফুটবল। 

বিশ্বকাপ শুরুর আগে মুসলিমবিরোধী স্লোগানের অভিযোগে স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছিল ফিফা। কিন্তু ইয়ামালের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সেই বিতর্ককে পেছনে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনাকে নানা তকমা দেয়া হয়। বলা হয় তারা প্রতারক, ফিফার প্রিয়পাত্র, অহংকারী, বর্ণবাদী। ফাইনালে তারা একটি বিতর্কিত লাল কার্ডও দেখে এবং ১০ জন নিয়ে খেলতে বাধ্য হয়। কিন্তু বিশ্বকাপজুড়ে মেসির শিল্পসম ফুটবল, তার জাদুকরী মুহূর্তগুলো এবং ফাইনাল শেষে তার অশ্রুসিক্ত মুখ তাকে খলনায়ক হিসেবে দেখার সুযোগই দেয়নি। 

ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তিই কখনও কখনও তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হওয়ায় এটি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি কিছুটা অভিশাপও। কারণ এই খেলাই একই মাঠে দাঁড় করায় এমন দেশগুলোকে, যারা একসময় যুদ্ধে জড়িয়েছিল কিংবা আজও অতীতের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। একই সঙ্গে অন্য কোনো খেলার তুলনায় ফুটবলই সবচেয়ে বেশি আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। এই জনপ্রিয়তার কারণেই ফুটবল নিয়ে মন্তব্য করতে এগিয়ে আসেন ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী এবং নানা মতামত লেখক। নিজেদের ক্ষেত্রের বিশ্লেষণে তারা যতই নিরপেক্ষ হোন না কেন, ফুটবলের ক্ষেত্রে অনেকেই অযৌক্তিক জাতীয়তাবাদ বা অন্ধ সমর্থকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। 

প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবলের বাইরের নানা বিশ্লেষণের মুখোমুখি হয়। অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাকে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করা হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ভারে জর্জরিত করা হয়। অথচ ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার সরলতায়। ফুটবলকে তার মতো থাকতে দেয়াই ভালো। শেষ পর্যন্ত এটি কেবল ১১ জন বনাম ১১ জনের একটি খেলা, যেখানে লক্ষ্য একটাই- প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ানো। 

ফুটবলের আসল সৌন্দর্য তার মহান শিল্পীদের দক্ষতায়। এই বিশ্বকাপে সেই শিল্পীর অভাব ছিল না। প্রায় দিনই দেখা গেছে রোমাঞ্চকর ম্যাচ। মেসি, রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আরলিং হালান্ড- প্রত্যেকের খেলার ধরন আলাদা, পরিচয় আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় তারা এক। তা হলো তারা কোটি ভক্তকে আনন্দ দিয়েছেন এবং আজীবনের স্মৃতি উপহার দিয়েছেন। পাশাপাশি ছিল বেশ কিছু রূপকথার গল্প, যা নেতিবাচকতাকে সরিয়ে দিয়েছে। 

বিশ্বকাপে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে ইরান দল শঙ্কিত ছিল, তাদের প্রতি বৈরী আচরণ হতে পারে। সেই আশঙ্কা অমূলক ছিল না। ইরানের অধিনায়ককে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে মেক্সিকোতে দলের বেস ক্যাম্প থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে গেলেও তারা নানা ধরনের দুর্ব্যবহারের শিকার হন। ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইরানের খেলোয়াড়দের গাড়িতে তুলে বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হতো। ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানবান্দ ছোটবেলায় যাযাবর পশুপালক পরিবারের সন্তান ছিলেন। কিশোর বয়সে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি পকেটে টাকা ছাড়াই তেহরানে পালিয়ে যান। গাড়ি ধোয়া ও পিজ্জার দোকানে কাজ করে জীবন চালিয়েছেন। সেই মানুষটিই বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের শক্তিশালী আক্রমণভাগকে ঠেকিয়ে দুর্দান্ত গোলরক্ষণের প্রদর্শনী করেন। তার একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ দেখে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকরাও মুগ্ধ হয়ে যায়। 

ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল ফিফা অনুমোদিত এক সেনেগালিজ রেফারিকে বহিষ্কার করা। কিন্তু সেই বিতর্কের মাঝেও জন্ম নেয় এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প। কানাডার অধিনায়ক আলফনসো ডেভিস শিশু অবস্থায় লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পরিবারসহ পালিয়ে ঘানায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে কানাডা তাদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করে। ইংরেজি না জানা ছোট্ট আলফনসো একদিন কানাডা জাতীয় দলের অধিনায়ক হন। বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়ার পর প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোয় ওঠার পথে তার গোলই ইতিহাস গড়ে দেয়। যে দেশ একসময় তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, সেই দেশের জাতীয় বীর হয়ে ওঠেন তিনি। 

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ ভিসা ফিও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তবে সেখানেও ফুটবল এক আবেগঘন গল্প তৈরি করে। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার মা তার ছেলের বিশ্বকাপ খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে যেতে পারেননি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ১৫ হাজার ডলারের ভিসা ফি তার পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। পরবর্তী চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ড্রয়ের ম্যাচে ভোজিনহা প্রায় সাতটি নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দেন। তিনি ছিলেন মানবপ্রাচীরের মতো। ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি মাকে খুব মিস করার কথা বলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র সরকার হস্তক্ষেপ করে। পরবর্তী ম্যাচে তার মা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন। 

আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসে ফুটবল। বিশ্বকাপ যতবারই ফুটবলের বাইরের দিকে সরে যেতে চেয়েছে, ততবারই ফুটবলাররা নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে তাকে আবার মাঠের খেলায় ফিরিয়ে এনেছেন। এটাই ছিল এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা- সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে ফুটবল।
(অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ)

সৈয়দ নাজমুল আহসান

১ দিন আগে

অনন্য🌹

Md.Mosharaf Hossain

১ দিন আগে

বিশ্বকাপ যতবারই ফুটবলের বাইরের দিকে সরে যেতে চেয়েছে, ততবারই ফুটবলাররা নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে তাকে আবার মাঠের খেলায় ফিরিয়ে এনেছেন। এটাই ছিল এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা- সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে ফুটবল। সুন্দর বিশ্লেষণ !

মন্তব্য করুন