মেসি-জ্বরে কাঁপছে কলকাতা, নীল-সাদা আবেগে ভাসছে পুরো শহর

মেসি-জ্বরে কাঁপছে কলকাতা, নীল-সাদা আবেগে ভাসছে পুরো শহর

ফন্ট সাইজ:

সেদিন ৪ জুলাই, ভোর ৫টা ৪৫ মিনিট। আকাশজুড়ে ধূসর মেঘ, রাতভর বৃষ্টিতে কাদামাখা ছোট্ট একটি পার্ক। কিন্তু সেই প্রতিকূল আবহাওয়াও থামাতে পারেনি প্রায় ৩০০ ফুটবলপ্রেমীকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার অমর্ত্য সেন উদ্যানে বড় পর্দায় আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখতে জড়ো হন তারা।
বড় বড় লাউডস্পিকার, নীল-সাদা পতাকা, প্লাস্টিকের ফুটবল আর আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়দের বিশাল কাটআউটে পুরো এলাকাটি যেন রাজনৈতিক সমাবেশ কিংবা রক কনসার্টের আবহ তৈরি করেছিল। ম্যাক অ্যালিস্টার, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বা রোমেরোর কাটআউট থাকলেও সবচেয়ে বেশি ছিল লিওনেল মেসির প্রতিকৃতি। এটাই কলকাতা আর্জেন্টিনা ফুটবল ফ্যান ক্লাবের অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলেই এখানে আর্জেন্টিনা ভক্তদের উন্মাদনা চরমে পৌঁছে যায়।

ভোররাত থেকেই মেসির অপেক্ষা

সেদিন ম্যাচ শুরু হয়েছিল রাত সাড়ে ৩টায়। তখন থেকেই ভক্তরা মাঠে অবস্থান করছিলেন। বৃষ্টিভেজা ভোরে তারা যেন কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নয়, বরং মেসির জন্যই একত্রিত হয়েছিলেন।

ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। পরে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ গোল করলে মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়েন দর্শকরা। কেউ চিৎকার করছেন, কেউ ভিডিও ধারণ করছেন, কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন।
এরপর ধীরে ধীরে চারদিকে একটিই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে- “মে-সি! মে-সি! মে-সি!”। বাংলার উচ্চারণে এই ডাক যেন পুরো পার্ককে মুখরিত করে তোলে।

৩৯ বছরেও কলকাতার চোখে সবার ওপরে মেসি

সম্প্রতি ৩৯ বছরে পা রাখা মেসি এমন এক বিশ্বকাপে খেলছেন, যেখানে আছেন ৪০ বছর বয়সী লুকা মদরিচ, ম্যানুয়েল নয়ার, ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, পাশাপাশি কিলিয়ান এমবাপে, এরলিং হলান্ড, হ্যারি কেইন ও লামিনে ইয়ামালের মতো তারকারাও।
তবুও কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ২০২৬ সালের মেসির তুলনা নেই। তাদের বিশ্বাস, বয়স বাড়লেও মেসি আগের চেয়েও পরিণত, আরও নিখুঁত।

গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার ছয়টি গোলই করেছেন মেসি। কেপ ভার্দে, মিসর, সুইজারল্যান্ড কিংবা ইংল্যান্ড- প্রতিটি কঠিন ম্যাচেই তিনি দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন।
মিশরের বিপক্ষে ৮৩ মিনিটে করা তার সমতাসূচক গোল এবং গোলের পর আবেগঘন কান্না কলকাতার আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আরও বেশি আবেগাপ্লুত করে।

‘টিভিতে দেখা আর সামনে দেখা এক নয়’

কলকাতার ক্রীড়া আলোকচিত্রী ও আজীবন আর্জেন্টিনা সমর্থক দেবজয় বিশ্বাস সম্প্রতি উত্তর আমেরিকায় গিয়ে মেসির খেলা কাছ থেকে দেখেছেন।
তার ভাষায়, টিভিতে শুধু বল নিয়ে তার খেলা দেখা যায়। কিন্তু মাঠে গেলে বোঝা যায় বল ছাড়া কী অসাধারণভাবে জায়গা তৈরি করেন তিনি। সেটাই আমার কাছে ফুটবলের স্বর্গের সবচেয়ে কাছাকাছি অভিজ্ঞতা।

তিনি মেসির একটি ছবির কথাও বলেন, যেখানে গোল করার পর উল্লাসরত দর্শকদের দিকে ছুটে যাচ্ছেন মেসি, আর পেছনে পড়ে আছেন পরাজিত প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা।

মেসিকে পরিবারের সদস্য মনে করেন অনেকে

কলকাতার চা দোকান মালিক শিব শঙ্কর পাত্র ও তার পরিবার পুরোপুরি আর্জেন্টিনা-ভক্ত। তার স্ত্রী সপ্না পাত্র বলেন, আগে আমার স্বামী নিজেকে মেসির বড় ভক্ত ভাবতেন। কিন্তু গত বছর কলকাতায় মেসির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাওয়ার পর এখন তিনি মেসিকে নিজের ভাই মনে করেন।

তাদের বাড়ির বাইরের দেয়াল নীল-সাদা রঙে আঁকা। দোকানের নাম ‘আর্জেন্টিনা টি স্টল’। বাড়ির সামনে সবসময় উড়তে থাকে আর্জেন্টিনার পতাকা।

সম্প্রতি তারা মেসির ৩৯তম জন্মদিন উপলক্ষে ১৮ কেজি ওজনের নীল-সাদা কেক কেটে স্থানীয়দের মধ্যে বিতরণ করেন। শিশুদের উপহার দেন আর্জেন্টিনার জার্সিও।
সপ্না পাত্র জানান, তার মেয়েও মেসির ভক্ত। এমনকি নিজের ছেলের নাম রেখেছেন লিও।

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ফুটবল পাগল শহর?

১৮৯০-এর দশক থেকেই কলকাতা ফুটবলের শহর হিসেবে পরিচিত। অথচ ভারত কখনও বিশ্বকাপে খেলতে না পারলেও শহরটির ফুটবলপ্রেম কমেনি। ভারতের কিংবদন্তি ফুটবলার চুনি গোস্বামী একবার বলেছিলেন, সাহিত্য ও শিল্পকলার পাশাপাশি ফুটবলই কলকাতাকে দেশের অন্য শহরগুলোর থেকে আলাদা করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোহনবাগান ও ইস্ট বেঙ্গলের শতবর্ষী প্রতিদ্বন্দ্বিতা কলকাতার ফুটবল সংস্কৃতিকে আরও গভীর করেছে। এখানে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, বরং সংস্কৃতি, আবেগ ও পরিচয়ের অংশ।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ টেলিভিশনে সম্প্রচার শুরু হওয়ার পর কলকাতার মানুষ প্রথমবারের মতো ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদু দেখেছিল। তার আগে শহরটির বেশিরভাগ সমর্থক ছিল ব্রাজিলের।

তবে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর মেসির জনপ্রিয়তা কলকাতায় নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এখন নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ ফুটবলপ্রেমীর প্রথম পছন্দ আর্জেন্টিনা।

অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জনপ্রিয়তা আগের মতো নেই। অনেক পর্তুগাল সমর্থকও মনে করেন, দলটি এখন নতুনদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়া উচিত।

ব্রাজিলের ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে

যদিও আর্জেন্টিনার সমর্থক বেড়েছে, তবু কলকাতার বহু এলাকায় এখনও ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ পতাকা দেখা যায়। পেলে, গ্যারিঞ্চা, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো কিংবা নেইমারের স্মৃতি এখনও অনেক সমর্থকের হৃদয়ে জীবন্ত।

কলকাতার এক সাবওয়ে রেস্তোরাঁর কর্মী সুধাংশু সিং, যিনি ব্রাজিলের সমর্থক, বলেন, নেইমার ছাড়া ব্রাজিলকে আগের মতো মনে হয় না। তবু ফুটবলই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।

তার ভাষায়, বিশ্বকাপের সময়সূচি এবার দারুণ হয়েছে। রাতের শিফটে কাজ করেও সব ম্যাচ দেখা যায়। তবে আমি খেলা দেখার চেয়ে খেলতেই বেশি ভালোবাসি।
এই অনুভূতিই যেন কলকাতার ফুটবল সংস্কৃতির আসল পরিচয়- এখানে ফুটবল শুধু দেখার বিষয় নয়, বরং জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রশান্ত

৯ ঘন্টা আগে

কলকাতা কেন, সারা ভারত কাঁপছে কারণ আর্জেন্টিনাকে ল্যাটিন আমেরিকার ইস্রাঈল বলা হয় আর ভারত ইস্রাঈলের পরীক্ষিত বন্ধু!

মন্তব্য করুন