আর্জেন্টিনায় উদ্ভট সব আচার, অনুষ্ঠান

স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল

আর্জেন্টিনায় উদ্ভট সব আচার, অনুষ্ঠান

ফন্ট সাইজ:

শিরোপা ধরে রাখার সম্ভাবনায় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে স্নায়ুচাপ। সেই চাপ কমাতে অনেকেই আশ্রয় নিচ্ছেন বহুদিনের বিশ্বাসে গড়ে ওঠা নানা আচার, অনুষ্ঠানের। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে সৌভাগ্যের জন্য বিশেষ রীতি বা টোটকা পালন খুবই পরিচিত একটি বিষয়। এই চর্চাই অনেক সমর্থককে মানসিকভাবে স্বস্তি দিচ্ছে। বুয়েন্স আয়ারসের শ্রমজীবী এলাকা লিনিয়ার্সের বাসিন্দা আঁন্দ্রে গনজালেস বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, খেলা চলার সময় আগের ম্যাচে যে যেখানে বসেছিল, সেখান থেকে কেউ নড়তে পারে না। নিজেকে ‘ফুটবলপাগল’ বলে পরিচয় দেয়া ৪৮ বছর বয়সী এই হিসাবরক্ষকের মতে, সবাইকে এই নিয়ম মেনে চলতেই হবে। তিনি বলেন, কেউ যদি বাথরুমে যাওয়ার সময় গোল হয়ে যায়, তাহলে তাকে সেখানেই আটকে রাখা হয়। ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে আর বের হতে পারে না।

গনজালেস যে রীতির কথা বলছেন, সেটিকে আর্জেন্টিনায় বলা হয় ‘কাবালা’। অর্থাৎ এমন একটি আচার, যা সৌভাগ্য বয়ে আনে বলে বিশ্বাস করা হয়। সমাজের সর্বস্তরেই এই ধরনের বিশ্বাসের প্রচলন রয়েছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে-ও বৃহস্পতিবার নিজের সৌভাগ্যের রীতির কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি এল অবসেরভাদর রেডিওকে বলেন, বিশ্বকাপ চলাকালে তিনি ‘কোনো অবস্থাতেই’ প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ছাড়া অন্য কোথাও বসে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখবেন না।

বিক্রয়কর্মী এস্তেলা ভার্গাসের বাড়িতেও ম্যাচের দিনের নিয়ম একেবারে স্থির। পরিবারের সবাই একই পোশাক পরেন, একই চেয়ারে বসেন। শুধু পরিবারের কুকুরটিকে থাকতে হয় বাড়ির বাইরে। ৬৫ বছর বয়সী ভার্গাস বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ও যেহেতু ইংলিশ বুলডগ, তাই ওকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে বৃষ্টি হোক বা রোদ- ও বাইরে থাকবে।

অন্যদিকে গ্রাসিয়েলা কাম্পোসের বাড়িতে ম্যাচ শুরু হলেই তার শাশুড়িকে ঘর ছেড়ে রান্নাঘরে যেতে হয়। কাম্পোস বলেন, তিনি রান্নাঘরে বসে আকাশি-সাদা রঙের একটি স্কার্ফ বুনতে থাকেন।

অন্যের কাছে এসব আচরণ হাস্যকর মনে হলেও, যারা এগুলো পালন করেন তাদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞানী দিয়েগো মুরজি এএফপিকে বলেন, ফুটবলে আর্জেন্টাইনরা নিজেদের শুধু দর্শক মনে করেন না, বরং খেলাটির অংশগ্রহণকারী বলে মনে করেন। তিনি বলেন, এই আচারগুলো সেই অনুভূতিরই অংশ। মানুষ বিশ্বাস করে, এগুলো সৌভাগ্য এনে দেয় এবং অমঙ্গল দূর করে। তার ভাষায়, ফুটবল সংস্কৃতির সর্বত্রই এ ধরনের বিশ্বাসের উপস্থিতি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের কোচ কার্লোস বিলার্দোর উদাহরণ তুলে ধরেন।

মুরজি বলেন, বিলার্দো ছিলেন বিজ্ঞানের মানুষ। কিন্তুবিশ্বাসের দিক থেকে তিনি ছিলেন চরম পর্যায়ের। তিনি একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন। আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের সময় ড্রেসিংরুমে একটি টেলিফোন বেজে ওঠে। একজন খেলোয়াড় ফোনটি ধরলেও ওপাশ থেকে কেউ কোনো কথা বলেনি। মুরজি বলেন, বিলার্দো এটি দেখেছিলেন। যেহেতু আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচ জিতেছিল, এরপর প্রতিটি ম্যাচের আগে তিনি কাউকে দিয়ে ওই ফোনে কল করাতেন। একই খেলোয়াড় ফোন ধরতেন এবং নিশ্চিত করা হতো যেন ওপাশ থেকে কেউ কোনো উত্তর না দেয়।

বুয়েন্স আয়ারসের প্রায় সব মহল্লাই আকাশি-সাদা রঙে সেজে উঠেছে। উন্মাদনা আর স্নায়ুচাপ যেন পাশাপাশি চলছে। ৭৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত লিদিয়া ওতেরো বলেন, আমার সব টোটকাই প্রতিবার কাজ করে। জাতীয় দলের পাশাপাশি প্রিয় ক্লাব বোকা জুনিয়র্স-এরও নিবেদিত সমর্থক তিনি। প্রতিপক্ষের দখলে বল থাকলে তিনি টেলিভিশনের সামনে কী ধরনের অঙ্গভঙ্গি করেন বা কী স্লোগান দেন, সেটিও এএফপিকে দেখান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের প্রথমার্ধের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমার কুকুরটি টিভির দিকে তাকিয়ে বসেছিল। তখন আর্জেন্টিনা কোনো গোল করতে পারেনি। এরপর তিনি বলেন, জানেন আমি কী করলাম? দ্বিতীয়ার্ধে ওকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলাম। তারপরই ম্যাচের ফলও উল্টে গেল।

২০২০ সালে মারা যাওয়া ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা এখনও আর্জেন্টিনায় ভক্তদের কাছে পূজ্য ব্যক্তিত্ব। বুয়েন্স আয়ারসের ভিয়া দেবোতো এলাকায় তার আগের বাড়ির সামনে প্রিয় ‘১০ নম্বর’কে স্মরণ করে একটি বেদি তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিপক্ষকে ‘ঠাণ্ডা’ করে দেয়ার পুরোনো বিশ্বাসও এখনও টিকে আছে। ১১ বছর বয়সী মেসিভক্ত রদ্রিগো সেরনা বলেন, আমি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের স্টিকার নিয়ে ফ্রিজে রেখে দিই। এটা আমাকে আমার দাদু শিখিয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন