২০২২ সালের ডিসেম্বর। কাতার বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে স্পেন বিদায় নেয়ার ঠিক দুইদিন পর জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে ঘোষণা করা হয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের নাম। তখন স্প্যানিশ ফুটবলের বাইরের প্রতিক্রিয়া ছিল একটিই- ‘কে এই লোক?’ প্রশ্ন ওঠাটা অস্বাভাবিক ছিল না। এক দশক আগে স্পেনের তৃতীয় বিভাগের একটি ক্লাবে মাত্র ১১ ম্যাচে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতাই ছিল তার জ্যেষ্ঠ পর্যায়ে প্রধান কোচ হিসেবে একমাত্র খতিয়ান। অনভিজ্ঞতার এমন রেকর্ড নিয়ে স্পেনের মতো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রেসার-কুকারে বসাটা বড় এক ঝুঁকিই মনে হয়েছিল। তবে সেই ৬১ বছর বয়সী কোচের ওপরই বাজি ধরেছিল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (আরএফইএফ)।
চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বমঞ্চে সেই আনকোরা, শান্ত স্বভাবের লোকটাই ইতিহাস লিখলেন। ইস্ট রাদারফোর্ডে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বজয়ের মধ্যদিয়ে দে লা ফুয়েন্তে ইতিহাসের বয়োজ্যেষ্ঠ বিশ্বজয়ী কোচ বনে গেছেন। স্প্যানিশ বস নজির গড়েছেন আরও, সম্পন্ন করেছেন ফুটবলের বিরলতম এক ‘ট্রেবল’- ২০২৩ উয়েফা ন্যাশনস লীগ, ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। লা রিয়োহার ছোট শহর হারোতে ১৯৬১ সালে জন্ম নেন দে লা ফুয়েন্তে। পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে অ্যাথলেটিক বিলবাও ও সেভিয়াতে ডিফেন্ডার হিসেবে খেলেছেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিংয়ে আসেন একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে। স্থানীয় লীগ, অনূর্ধ্ব দল এবং একাডেমি ফুটবলে বছরের পর বছর কাজ করার পর তিনি ২০১১ সালে আলাভেসের হয়ে প্রথম বড় দায়িত্ব পান। তবে মাত্র ১১ ম্যাচ পরেই তাকে বরখাস্ত করা হয়। সেই একটি ব্যর্থতাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
২০১৩ সালে স্প্যানিশ ফেডারেশনে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ হিসেবে যোগ দেন তিনি। আর সেখান থেকেই শুরু হয় মূল ইতিহাসের বুনন। স্পেন জাতীয় দলের ভিত মূলত তৈরি হয়েছে লা ফুয়েন্তের হাত ধরেই। অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২১ এবং পরবর্তীতে ২০২১ টোকিও অলিম্পিকে স্পেনের রৌপ্যজয়ী দল- প্রতিটি ধাপেই তরুণদের গুরু ছিলেন তিনি। রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ, মিকেল মেরিনো বা উনাই সিমনরা যখন ১৫-১৬ বছরের কিশোর, তখন থেকেই তাদের গড়ে তুলেছেন দে লা ফুয়েন্তে। তারকা কোচের পেছনে মোটা অঙ্কের অর্থ না ঢেলে ভেতর থেকে চেনা মানুষটিকে উঠে আনার এই স্ট্র্যাটেজিই স্পেনকে আজ এই ট্রফির পাহাড়ে দাঁড় করিয়েছে।
দে লা ফুয়েন্তের চার বছরের মহাকাব্যের পৃষ্ঠা ওল্টালে দেখা যাবে ২০২৩ সালের উয়েফা ন্যাশনস লীগ জয়, ২০২৪-এর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয় এবং ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়। তবে সবকিছু আবার এতটা মসৃণও ছিল না। স্পেন ফুটবলের ভেতরের রাজনীতি আর বিতর্কও তাকে স্পর্শ করে একটা সময়ে। ২০২৩ সালে রুবিয়ালেস কাণ্ডে হাততালি দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। পরে আদালতে সাক্ষী হিসেবেও হাজির হতে হয়। তবে দলীয় ড্রেসিংরুমে তার জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি। দে লা ফুয়েন্তের বন্দনা শোনা যায় বর্তমান স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়ন আলেক্স বায়েনার গলায়, বলেন, ‘লুইস আমাদের সবসময় একটা শান্ত পরিবেশ আর আত্মবিশ্বাস দেয়। আমরা সত্যি গর্বিত যে তিনি আমাদের কোচ। খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্প্যানিশ বসের সম্পর্ক কেবল কোচের নয়, বরং একজন অভিভাবকের। বিশ্বকাপের মাঝপথেই ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়া স্প্যানিশ রেডিওতে মজা করে বলেছিলেন, স্পেন জিতলে তিনি হাতে কোচের ছবি ট্যাটু করাবেন। বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই কথার জবাব দে লা ফুয়েন্তে দেন নিজের স্বভাবসুলভ রসবোধ দিয়ে, ‘ট্যাটু করানোর বয়স আমার পার হয়ে গেছে। তবে আমার ছেলেরা কথার দাম দিতে জানে।
আমি ততটাও দেখতে খারাপ নই!’ কোথায় ট্যাটু দেখতে চান- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে হেসে তিনি বলেন, ‘শরীরের এমন কোথাও যেন করা হয়, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না!’ ২০২৬ বিশ্বকাপ যদি কোনো সুপারস্টারের বিশ্বকাপ হয়ে থাকে, তবে স্পেন ছিল তার একদমই ব্যতিক্রম। পেদ্রিকে বেঞ্চে রাখা কিংবা লামিন ইয়ামালকে একচ্ছত্র নায়ক বানানোর বদলে রক্ষণাত্মক কাজ করানো- দে লা ফুয়েন্তের সিস্টেমে সবাই ছিলেন সাধারণ সেনাপতি।
উনাই সিমন বা কুকুরেয়া, রদ্রি কিংবা মিকেল ওইয়ারজাবাল- স্পেন স্কোয়াডের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই ক্লাব ফুটবলে চোট কিংবা খারাপ ফর্মের মধ্যদিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়াতেই তারা নিখুঁত এক মেশিনের মতো খেলেছেন। যেখানে দলগত শৃঙ্খলা, হাই-প্রেস আর পজিশন ভিত্তিক ফুটবলে বিশ্বকে মোহিত করেছে স্পেন। অনেকটা নীরবে, চশমা পরা বিজ্ঞান শিক্ষকের মতো দেখতে এই ব্যক্তিত্ব স্প্যানিশ ফুটবলে নিয়ে এসেছেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। একের পর এক ট্রফি জিতে দে লা ফুয়েন্তে প্রমাণ করে দিয়েছেন- তারকা নয়, ফুটবল খেলাটা দিনশেষে একটা সঙ্ঘবদ্ধ দলেরই খেলা!
