জুলাইয়ের ঘটনায় ভুয়া মামলা ফাঁসছেন বাদীরা

ফন্ট সাইজ:

যাত্রাবাড়ী রোজভিউ হোটেলের ম্যানেজার ছিলেন রাহাত হাসান বিপু। চব্বিশের ১৪ই আগস্ট বিকালে যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের সামনে গণপিটুনিতে আহত হন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে নিলে তিনি মারা যান। বিকালে ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ নিয়ে যায় পরিবার। পরে সেপ্টেম্বর মাসে রাহাতকে জুলাই আন্দোলনে শহীদ দেখিয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন তার স্ত্রী রুবিনা আক্তার। মামলা নং-২০/২০২৪। এতে দেড় শতাধিক আসামি করা হয়। পরে টাকা নিয়ে অনেকের নাম আসামির তালিকা থেকে বাদ দিতে আদালতে পৃথক কয়েকটি আবেদনও করে বাদীর পরিবার। তবে আদালত তা আমলে নেয়নি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ বলছে, ১৪ই আগস্ট সকালে সায়েদাবাদে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের অভিযোগে তিনজনকে গণধোলাই দেয় অজ্ঞাত ব্যক্তিরা। ওই ৩ জনের মধ্যে একজন ছিল ম্যানেজার রাহাত হোসেন।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার দুস্তারা ইউনিয়ন বিএনপি’র সহ-সভাপতি বাবুল মিয়া মারা যান ২০২৩ সালে। অথচ তাকে ৪ই আগস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিহত দেখিয়ে মামলা করে আরেক বিএনপিকর্মী। আড়াইহাজার থানার মামলা নং-০৮/২৪। ওই মামলায় ১৩১ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় অনেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আসামি করা হয়। পরে পুলিশের তদন্তে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আরেকটি ঘটনা ঘটে উত্তর পূর্ব থানা এলাকায়। জীবিত জানে আলমকে জুলাই আন্দোলনে শহীদ দেখিয়ে আদালতে হত্যা মামলার আবেদন করা হয়। সিআর মামলা নং-৩৫/২০২৪। এতে শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তদন্ত সূত্র বলছে, মামলা করে একটি চক্র এজাহারের কপি আসামিদের মুঠোফোনে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। কেউ কেউ ঝামেলা এড়াতে টাকাও দেয়। যারা টাকা দিয়ে আপস করেছেন, এমন আসামিদের নাম মামলার আবেদন থেকে প্রত্যাহার করতে আদালতে এফিডেভিটও জমা দেন ভুয়া বাদী চক্র। আদালত তা আমলে নেয়নি। পরে পুলিশের তদন্তে মামলার ভিকটিম মৃত ব্যক্তিকে জীবিত পাওয়া যায়। এবং হত্যার পর তার লাশ গুমের ঘটনাও মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আরেকটি ঘটনা ঘটে আশুলিয়ায়। সেখানে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ভুয়া নাম, ঠিকানা, এনআইডি দিয়ে জুলাই শহীদ সাজিয়ে একটি হত্যা মামলা করা হয়। যার সিআর মামলা নং-১৬২৭/২৪। এই মামলার বাদীও ভুয়া। পুলিশ তদন্তে বাদীর কোনো হদিস পাননি। তবে এই মামলায়ও আসামিদের তালিকা থেকে বাদ দিতে একাধিক এফিডেভিট আদালতে জমা দেয় প্রতারক চক্রটি। সেখানেও টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। শুধু হত্যা মামলা হয়, দুর্ঘটনায় আহত, মারামারিতে জখম, আগুনে পোড়ার ঘটনাকে জুলাই আন্দোলনে আহত দেখিয়ে শত শত মামলা করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, মামলা দিয়ে আসামিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে আর মামলা পরিচালনা করতে চান না বাদীরা।

সম্প্রতি পুলিশের একাধিক বিশেষ ইউনিট থেকে জুলাই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। এতে ছাত্র আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া মিথ্যা হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে এবার উল্টো বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তে একের পর এক মামলায় মিথ্যা তথ্য, ভুয়া অভিযোগ, জীবিত ব্যক্তিকে নিহত দেখানো, এমনকি মৃত ব্যক্তিদের আসামি করার প্রমাণ মিলছে। একটি চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা করে নিরীহ মানুষকে হয়রানির চেষ্টা করেছে। পুলিশ সদর দপ্তর ও সিআইডি’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েকটি মামলায় জীবিত ব্যক্তিকে শহীদ দেখিয়ে হত্যা মামলা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত বাদীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এমন অন্তত ১১০টি মামলা শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দেয়ার প্রমাণ মিলছে, তাদের আইনের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে দু’-একটা মামলাও করা হয়েছে। বাকি তথ্য ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা যাচাই করে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

এদিকে পিবিআই’র তদন্তে পাওনা টাকা আদায়ে মামলা, এমনকি ডিভোর্স দেয়ায় স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের ফাঁসাতে ছেলেকে দিয়ে মিথ্যা মামলা করানোর প্রমাণ মিলেছে পিতার বিরুদ্ধে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মামলাকে জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ঘটনা দেখিয়ে মামলা করার প্রমাণ মিলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি তদন্ত সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একটি পক্ষ মামলা দিয়ে অর্থ আয়ের চেষ্টা করেছে। এতে ধরে ধরে ব্যবসায়ীদের আসামি করা হয়। এবং মামলার এজাহার পাঠিয়ে টাকা দাবি করা হয়। এসব মামলাগুলো ভিকটিম, বাদী এবং ঘটনাস্থল সবই মিথ্যা। এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমন কিছু মামলার বাদীর পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তবে এখন তারা মামলা করার কথা অস্বীকার করছে। কিছু মামলা আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে করা হয়। অনেক মামলায় ঘটনার সময় দেশের বাইরে থাকা ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়। আবার কোথাও বহু আগেই মারা যাওয়া ব্যক্তিদের নামও এজাহারে যুক্ত করা হয়। এসব মামলা তদন্তে বাদ দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমান মানবজমিনকে বলেন, আমাদের কাছে পুলিশের বিশেষ ইউনিটের কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন এসেছে। সেখানে অনেক ভুয়া বাদীর সন্ধান পাওয়া গেছে। চিফ প্রসিকিউটর ইতিমধ্যে সকল জেলার এসপি এবং পুলিশের সকল ইউনিটকে এ ধরনের মামলার তথ্য পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন। তথ্য পাওয়ার পর ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেসব মামলা আমাদের এখানে আছে, সেগুলো ট্রাইব্যুনালই ব্যবস্থা নেবে। অন্যগুলো সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হবে। কেউ ভুয়া মামলা করে হয়রানি করলে, তার ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন