চলতি ফিফা বিশ্বকাপে যখন দলগুলো মাঠে নামছে, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের মতো আমিও একটা দলকে সমর্থন করি। তবে আমার এই ভালোবাসার পেছনে কোনো অন্ধ আবেগ বা কেবল ট্রফি জয়ের পরিসংখ্যান নেই। এর পেছনে রয়েছে আজ থেকে বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া এক রূপকথার মতো বাস্তব অভিজ্ঞতা।
২০০৮ সালের সেই ঐতিহাসিক ইউরো এবং এক বাংলাদেশি তরুণ
সময়টা ২০০৮ সাল। অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের যৌথ আয়োজনে বসেছিল ইউরো ২০০৮-এর আসর। আমি তখন মাত্র ২১ বছরের এক তরুণ সংবাদকর্মী। পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একমাত্র সাংবাদিক ছিলাম আমিই। সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম কোনো একক বিদেশ যাত্রা। তখনকার দিনে বাংলাদেশে ইন্টারনেট আজকের মতো এতটা সহজলভ্য ছিল না। মা-বাবার উৎকণ্ঠা দূর করতে অস্ট্রিয়া বা সুইজারল্যান্ড থেকে যখন দেশে ফোন করতাম, প্রতি মিনিটে খরচ হতো ১ ইউরো! প্রতি রাতে তাঁরা আমার ফোনের অপেক্ষায় থাকতেন। আর আমিও অধীর অপেক্ষায় থাকতাম, কখন হবে মা-বাবার সঙ্গে আলাপ।
সেই তরুণ বয়সে আমি ফ্রান্স, সুইডেন, জার্মানি, তুরস্ক, ইতালি, রাশিয়া এবং নেদারল্যান্ডসের মতো বড় বড় দলের ম্যাচ কাভার করার সুযোগ পাই। জার্মানির থমাস হিৎজলসপার্গার কিংবা কিংবদন্তি মাইকেল ব্যালাকের মতো তারকারা আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, যা একজন তরুণ সাংবাদিক হিসেবে আমার জন্য ছিল বিশাল পাওয়া। কিন্তু, সমস্ত সমাদর আর আতিথেয়তার সীমানা ছাড়িয়ে আমার মন জয় করে নিয়েছিল কেবল একটি দল। স্পেন।
বোর্হা বিলবাও
স্পেন দলের তৎকালীন মিডিয়া ম্যানেজার ছিলেন বোর্হা বিলবাও। চশমা পরা, মৃদুভাষী মানুষটিকে দেখতে ঠিক কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপকের মতো লাগত। যখন আমি তাঁকে জানালাম যে, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি এবং সেখানকার একটি সংবাদপত্রের হয়ে কাজ করছি, তখন বিস্ময় ও আনন্দে তাঁর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। ২১ বছরের এক অনামী এশিয়ান তরুণকে তিনি যে সম্মান দিয়েছিলেন, তা আজও আমাকে ভাবায়।
সিনিয়র সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে মিক্সড জোনে তিনি আমাকে একের পর এক বিশ্বখ্যাত তারকাদের মুখোমুখি করে দিচ্ছিলেন। একদিন তো বিবিসির মতো বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমকে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি চিৎকার করে সেস্ক ফ্যাব্রিগাসকে ডেকে বললেন, “সেস্ক! সেস্ক! ওদের বাদ দাও, ও বাংলাদেশ থেকে এসেছে। ওর সঙ্গে কথা বলো!” তিনি আমার জন্য জাভি আলোনসোর সঙ্গে ১৫ মিনিটের একটি বিশেষ ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এমনকি যেসব খেলোয়াড় ইংরেজি বলতে পারতেন না, বিলবাও নিজে তাঁদের কাছে নিয়ে গিয়ে আমার পরিচয় করিয়ে দিতেন। এভাবেই জাভি, ফার্নান্দো তোরেস এবং ডেভিড ভিয়ার মতো তারকাদের সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত সুন্দর কর্ডিয়াল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। এমনকি পপ তারকা এনরিকে ইগ্লেসিয়াস এর সাথেও হয় সখ্য।
একদিন তো সংবাদ সম্মেলনে ইকার ক্যাসিয়াস আর কার্লেস পুয়োলের মতো মহাতারকাদের প্রশ্ন করার জন্য হলভর্তি সিনিয়র সাংবাদিকদের মধ্য থেকে বিলবাও নিজে আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। এমনকি একদিন মিডফিল্ড জাদুকর জাভি নিজে থেকে হেঁটে আমার কাছে এসে আমার নোটবুকে অটোগ্রাফ দিয়ে যান, অথচ আমি তাঁকে অনুরোধও করিনি। মাঠে ঢোকা বা বের হওয়ার সময় আমাকে দেখলেই তিনি সব সময় হাত দেখাতেন।
ডেভিড ভিয়ার দুষ্টুমি এবং সুইডিশ সমর্থকদের সেই ভয়াল রাত
স্পেন দলের স্ট্রাইকার ডেভিড ভিয়া ছিলেন ভীষণ আমুদে আর মিশুক প্রকৃতির মানুষ। একবার তাঁর এক দুষ্টুমির কারণে আমি বেশ বড় বিপদে পড়তে বসেছিলাম। ইনসব্রুকে সুইডেনের বিপক্ষে স্পেনের জয়ের পর উদযাপনের সময় ভিয়া মজা করে আমার ব্যাকপ্যাকের সামনের পকেটে একটি স্পেনের পতাকা গুঁজে দেন।
খেলা শেষে ভিয়েনা ফেরার জন্য যখন আমি ট্রেন স্টেশনে পৌঁছালাম, তখন ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত ছিল। গভীর রাতে স্টেশনে আটকা পড়লাম আমি। ঠিক তখনই একদল সুইডিশ সমর্থক, যারা হেরে গিয়ে ক্ষোভে এবং মদ্যপ অবস্থায় ছিল, আমার ব্যাগে স্পেনের পতাকা দেখে মারমুখী হয়ে তেড়ে আসে। একা এক বিদেশি তরুণ হিসেবে আমি তখন ভয়ে কাঁপছিলাম। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে অলৌকিক কিছুর মতোই একদল স্প্যানিশ সমর্থক এসে আমার চারপাশে একটা মানব-ঢাল বা সুরক্ষাবলয় তৈরি করে ফেলে। সেই উন্মত্ত সুইডিশদের হাত থেকে বাঁচাতে তারা সারারাত আমাকে মাঝখানে বসিয়ে পাহারা দিয়েছিল। সেই রাতের কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।
স্প্যানিশ ক্যাম্পের সেই জাদুকরী মুহূর্ত
তবে আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হলো স্পেনের পুরো দলের সঙ্গে বসে জার্মানি বনাম তুরস্কের সেমিফাইনাল ম্যাচটি দেখা। অনুশীলন শেষ করে স্পেনের খেলোয়াড়রা সবাই খেলা দেখছিলেন। তারা মনে মনে চাচ্ছিলেন তুরস্ক জিতুক, কারণ ফাইনালে জার্মানির চেয়ে তুরস্ককে মোকাবিলা করা সহজ হবে। তাই তুরস্ক যখনই কোনো আক্রমণ করছিল, ক্যাসিয়াস, জাভি, ভিয়ারা বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে উঠছিলেন। ২১ বছরের এক বাংলাদেশি তরুণ সেই বিশ্বজয়ী দলের একজন হয়ে খেলা দেখছে। এর চেয়ে অবাস্তব আর কী হতে পারে।
ইউরো ২০০৮-এর ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে যখন স্পেন চ্যাম্পিয়ন হলো, মিক্সড জোনে ডেভিড ভিয়া ট্রফি উদযাপনের মাঝেই আমার দিকে ছুটে এসেছিলেন আনন্দ ভাগাভাগি করতে। পুরো দলের খেলোয়াড়রা একে একে আমাকে হাই-ফাইভ দিচ্ছিলেন।
স্প্যানিশ ফুটবলের একক দর্শন
ফুটবলকে তারা কোনো যুদ্ধ মনে করে না, বরং মনে করে ক্যানভাসে আঁকা শিল্পকর্ম। স্পেনের এই খেলার শৈলী কিন্তু হুট করে জাতীয় দলে এসে তৈরি হয় না; এর শেকড় পোঁতা রয়েছে তাদের একদম তৃণমূল বা গ্রাসরুট লেভেলে। স্পেনের যেকোনো ছোট শহরের একাডেমি থেকে শুরু করে লা মাসিয়ার মতো বিখ্যাত মঞ্চ, সবখানেই শিশুদের প্রথম দিন থেকে শেখানো হয় বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে, ছোট ছোট পাসের ত্রিভুজ তৈরি করতে এবং স্থান বা 'স্পেস' তৈরি করার জ্যামিতিক হিসাব। প্রথাগত 'টিকি-টাকা'র সেই চেনা পাসিং সুতোকে ধরে রেখেই বর্তমান সময়ে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন এখন আরও গতিময়, আধুনিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। মাঠে যখন তাদের তরুণ উইঙ্গাররা গতি আর ড্রিবলিংয়ের ঝড় তোলে, কিংবা মিডফিল্ডাররা নিখুঁত পাসিংয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে চুরমার করে দেয়, তখন বুঝতে পারবেন এই সৌন্দর্যের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক অবিচল ফুটবলীয় সংস্কৃতি। ফুটবল খেলার এই নিজস্বতা, শৈল্পিক বুদ্ধিমত্তা এবং বলের ওপর রাজত্ব করার দর্শনই আমাকে বারবার স্পেনের প্রেমে পড়তে বাধ্য করে।
ভালোবাসা আর মর্যাদা
আজ ফুটবল অঙ্গনে তৃণমূল থেকে শুরু করে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মতো বড় ক্লাবের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে প্রায় ৫,০০০ ফুটবল কর্মকর্তা ও প্লেয়ারের সাথে পরিচয় আছে। কিন্তু আমি জানি, আমার জীবনে আর কোনোদিন দ্বিতীয় কোনো বোর্হা বিলবাও আসবে না আর স্পেন-এর মতো কোনো দলও আমাকে এতো ভালোবাসা আর মর্যাদা দেবেনা।
