আসন সমঝোতা, স্থানীয় নির্বাচন ও নেতৃত্বের গুরুত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে ১১ দলীয় ঐক্যে। টানাপড়েন থেকে জোটের বিভিন্ন কর্মসূচি বর্জন করছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস। সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ভেতরে শরিক কয়েকটি দলের ক্ষোভ এখন মাঠের কর্মসূচিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। কেউ ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচি বর্জন করছে, আবার কেউ নিজেদের নেতাদের নাম পোস্টার থেকে বাদ দিতে বলছে। ফলে শরিকদের ক্ষোভে এখন চাপের মুখে ১১ দলীয় ঐক্য।
সূত্রমতে, সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে অসন্তোষ, উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াতের একক প্রার্থিতা এবং জোটে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ থেকেই এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সবার আগে মাঠের কর্মসূচি থেকে সরে যায় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। দলটি গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকেই ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে না। অন্যদিকে আবদুল বাছিত আজাদের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস শুরুতে সক্রিয় থাকলেও সম্প্রতি ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগীয় সমাবেশ বর্জন করেছে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, আপাতত তারা জোটের কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকছেন না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের অংশ হয়ে কওমিধারার চারটি দল অংশ নেয়। এগুলো হলো- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (মামুনুল হক), খেলাফত মজলিস (আবদুল বাছিত আজাদ), নেজামে ইসলাম পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। যদিও শুরুতে জোটে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আলাদাভাবে নির্বাচন করে।
নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি, এনসিপি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসনে জয় পায়। জোটগতভাবে ৭৭টি সাধারণ ও ১৩টি সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে মোট ৯০ আসনের প্রধান বিরোধী জোটে পরিণত হয় ১১ দলীয় ঐক্য। নির্বাচনের পর থেকেই জোটের ভেতরে হিসাবনিকাশ নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। শরিকদের অভিযোগ, নির্বাচন পরবর্তী মূল্যায়ন হয়নি, ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাঠামো নিয়েও স্পষ্টতা নেই।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়েও বিরোধ: গত ২৭শে জুন ময়মনসিংহ বিভাগীয় সমাবেশের দিন খেলাফত মজলিসের রংপুর মহানগর সভাপতি তৌহিদুর রহমান মণ্ডল রাজু ফেসবুকে লিখেন, যুদ্ধে নামার আগেই ভাগ-বাটোয়ারা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ কৌশলের অংশ। নির্বাচন পরবর্তী মূল্যায়ন হওয়া জরুরি ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে জামায়াত এককভাবে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলনের পাশাপাশি দলটি নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণাও এগিয়ে নিচ্ছে, অথচ অন্য শরিকরা কেবল দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের এক শীর্ষ নেতা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। আগে যারা নেতৃত্বে ছিলেন, এখন তাদের চেয়ে এনসিপি’র নতুন নেতৃত্ব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী ১৮ই জুলাই বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশের পোস্টারে খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলনের নেতাদের নাম না থাকায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। খেলাফত আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, তারা আর ১১ দলীয় ঐক্যের অংশ নন।
এসব বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মানবজমিনকে বলেন, এটি কোনো স্থায়ী জোট নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি একটি নির্বাচনী ঐক্য হিসেবে গঠিত হয়েছিল। ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আসন বণ্টন নিয়ে শরিকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগটি সঠিক বা যথার্থ নয়। নির্বাচনী ঐক্য করার সময়ই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, প্রতিটি দলের সাংগঠনিক অবস্থান, মাঠের শক্তি, নেতৃত্ব, জনসমর্থন ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আসন সমন্বয় করা হবে। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের সময় মাঠের বাস্তবতা, জনশক্তি ও নেতৃত্বের সক্ষমতা বিবেচনা নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। নির্বাচন হয়েছে, ফলাফলও এসেছে। এরপরও কারও ব্যক্তিগত বক্তব্য বা ক্ষোভ থাকতে পারে। রাজনৈতিক জোটে এ ধরনের বিষয় স্বাভাবিক।
১১ দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে জামায়াত কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমরা নিয়মিতই বৈঠক করছি। শরিকদের দাওয়াত দিয়ে বসছি। আমাদের একটি লিয়াজোঁ কমিটি রয়েছে। প্রয়োজন হলে শীর্ষ নেতারাও বৈঠকে বসেন। শীর্ষ নেতারা না বসলেও লিয়াজোঁ কমিটি নিয়মিত বৈঠক করে এবং সেখানেই বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা ও সমন্বয় করা হয়।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানী মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনের সময় আমাদের একটি আসনও দেয়া হয়নি। এতে আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত আমরা দেখলাম, বেশির ভাগ আসনেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তারপরও কয়েকটি আসনে আমরা নির্বাচন করেছি। কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে আমরা জোট থেকে দূরে সরে যাই।
তিনি বলেন, এখনো তারা আমাদের ১১ দলীয় জোটের অংশ বলেই উল্লেখ করে। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে ফেসবুক ও বিভিন্ন বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়েছি যে, নির্বাচনী সমঝোতা নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে।
ইউসুফ সাদিক হক্কানী বলেন, আমরা মনে করি আমাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। শুধু আমরা নই, জোটের আরও কয়েকটি দলও সম্ভবত একই ধরনের মূল্যায়নের অভাব অনুভব করছে। অন্তত আমাদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। যদি দুই-একটি আসনও দেয়া হতো, তাহলে আমরা আরও ভালোভাবে লড়াই করতে পারতাম। কিন্তু সে ধরনের কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। আর সে কারণেই আমরা ধীরে ধীরে জোট থেকে দূরে সরে গেছি।
