সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তবে তার আগে নিজের মন্ত্রিসভা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন তিনি নিজে। নতুন এই লেবার নেতা বলেন, তিনি তার শীর্ষ টিম চূড়ান্ত করার কাজ শেষ করেননি। কেন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে বার্নহ্যাম বলেন, দায়িত্ব নেয়ার আগেই যদি মন্ত্রিসভায় অর্ধেক রদবদল শুরু করি, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। তাই এখনই তা করা ঠিক হবে না। বার্নহ্যামের মন্ত্রিসভায় কারা থাকবেন, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন এড মিলিব্যান্ড ও শাবানা মাহমুদ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর দেয়া প্রথম ভাষণে সাবেক গ্রেটার ম্যানচেস্টরের মেয়র বার্নহ্যাম তার সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি সামাজিক পরিচর্যা (সোশ্যাল কেয়ার) ব্যবস্থার সংস্কারকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। এদিকে রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ দাবি করেছেন, বার্নহ্যামের কোনো ধরনের গণরায় নেই। তিনি বলেন, তিনি কোনো ধরনের জনসমর্থনের ম্যান্ডেট ছাড়াই দায়িত্বে আসছেন। তাই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অবিলম্বে একটি সাধারণ নির্বাচন হওয়া উচিত। অন্যদিকে বার্নহ্যামের আরও সমঝোতাভিত্তিক রাজনীতির আহ্বানকে স্বাগত জানিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ডেভি। তিনি বলেন, আমার দরজা খোলা। ডেভি জানান, তার দল বিশেষ করে পানি খাতের সংস্কার, জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস)-এর জন্য আরও সহায়তা এবং সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থায় পরিবর্তন, বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে পরিচর্যাকারীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দেখতে চায়।
গত মাসে উপনির্বাচনে জিতে সংসদে ফিরে আসা বার্নহ্যাম চলতি সপ্তাহে লেবার দলের ৩৭৯ জন এমপির সমর্থন এবং দলের সঙ্গে যুক্ত ১১টি শ্রমিক ইউনিয়নের সমর্থন পেয়ে নেতৃত্বের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেন। সোমবার রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্যার কিয়ের স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হবেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বার্নহ্যাম বলেন, আমি মন্ত্রিসভা নিয়ে সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত করছি। খুব শিগগিরই সিদ্ধান্তে পৌঁছাব এবং সোমবারই সেগুলো ঘোষণা করব। মধ্য লন্ডনে ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (টিইউসি) সদর দপ্তরে লেবার নেতা হিসেবে প্রথম ভাষণে তিনি বলেন, তার মন্ত্রিসভায় দলের সব অংশ এবং সমাজের সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তিনি বলেন, তার সরকার শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নতুন করে আশা ফিরিয়ে আনবে। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই জনগোষ্ঠীর প্রতি মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। তিনি আবারও ওয়েস্টমিনস্টার থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
দলীয় নেতৃত্বের লড়াইয়ে নাম ঘোষণার পর থেকেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বার্নহ্যামের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল। তিনি বলেন, তার সরকার কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনবে। গত ৪০ বছরের ‘নব্য উদারবাদী’ নীতিকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি তিনি নিজে সরকারে থাকার সময়কার নীতিরও সমালোচনা করেন এবং দেশকে পুনরায় শিল্পায়নের অঙ্গীকার করেন। লেবার এমপিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ লেবার দল গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করবেন। বার্নহ্যাম বলেন, আমরা যদি নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ি এবং ভিন্ন ভিন্ন দিকে টানতে থাকি, তাহলে বৃটেনের নতুন ডানপন্থাকে কখনোই পরাজিত করতে পারব না। তিনি আরও বলেন, তার সরকার পরিচালনার মূল বৈশিষ্ট্য হবে দোষারোপের রাজনীতি নয়, বরং সমস্যার সমাধান। শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি জানি আমি কী বিশ্বাস করি, কী করতে চাই। আমার একটি পরিকল্পনা রয়েছে।
বার্নহ্যামের ভাষণে নীতিগত বিস্তারিত ঘোষণা খুব বেশি ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহে ডাউনিং স্ট্রিটে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করবেন। তবে সাংবাদিকদের তিনি জানান, তার সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থার সংস্কার। এ খাতে পরিবর্তন আনতে তিনি যথেষ্ট রাজনৈতিক মূল্য দিতেও প্রস্তুত বলে জানান। সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থা ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে পৃথকভাবে পরিচালিত হয়। ফলে বার্নহ্যামের পরিকল্পিত সংস্কার শুধু ইংল্যান্ডেই কার্যকর হবে। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সরকার ও বিরোধী দল সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থার কাঠামো ও অর্থায়ন নিয়ে সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। এনএইচএস-এর মতো এই সেবা বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই বিপুল ব্যয়ের কারণে মানুষের নিজেদের বাড়িঘর পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়।
গর্ডন ব্রাউনের সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগে বার্নহ্যাম একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ব্যবহারের সময় বিনামূল্যে সেবা দেয়া হবে- এমন একটি ন্যাশনাল কেয়ার সার্ভিস গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমার বাবা আলঝেইমার্সে আক্রান্ত। পরিচর্যাকারী কর্মীদের কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। এটা তাদের দোষ নয়। পুরো ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থাকে এভাবে ফেলে রাখা যায় না। ওয়েস্টমিনস্টারের বিরুদ্ধে আমার অন্যতম অভিযোগ হলো, বছরের পর বছর তারা এসব বড় সিদ্ধান্ত নিতে পিছিয়ে গেছে।
সংসদ ডাকার দাবি
কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান কেভিন হলিনরেক বলেছেন, বার্নহ্যামের উচিত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অবকাশে থাকা পার্লামেন্ট অধিবেশন পুনরায় ডেকে তার পরিকল্পনা এমপিদের সামনে ব্যাখ্যা করা। তিনি বলেন, অ্যান্ডি বার্নহ্যামের এখনও সঠিক কাজ করার সুযোগ আছে। সোমবার সংসদে এসে তার পরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য রাখা এবং এমপিদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত। লেবারের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ইউনিয়ন ইউনিসনের প্রতিনিধি লিন্ডা হবসন বলেন, বার্নহ্যামকে অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং মানুষের কাছে যে আশার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা ফিরিয়ে আনতে হবে।
এর আগে দুইবার লেবার নেতা হওয়ার চেষ্টা করলেও এবারই সফল হন বার্নহ্যাম। গত মাসে মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে জয়ের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌঁছাতে যাচ্ছেন। প্রায় ১৮ মাস ধরে জনমত জরিপে লেবার পার্টি রিফর্ম ইউকের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। দলটির সমর্থকদের আশা, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বার্নহ্যামের আগমন সেই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারবে। গত মাসে স্যার কিয়ের স্টারমার লেবার নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তিনি আর সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি নন বলে মনে করেন। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের বড় ধরনের ভরাডুবি এবং পরে মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে বার্নহ্যামের জয়ের পর স্টারমারের ওপর দলীয় এমপিদের চাপ বাড়তে থাকে। তারা তাকে সরে দাঁড়িয়ে বার্নহ্যামের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়ার আহ্বান জানান।
শুক্রবার বার্নহ্যাম স্টারমারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, শ্রমিক ও ভাড়াটিয়াদের অধিকার সম্প্রসারণ, এনএইচএস-এর অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমানো এবং রেলব্যবস্থাকে আবারও সরকারি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
