কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। আর ফুটবল বিস্ময় লামিন ইয়ামাল। তাকে গোসল করাচ্ছেন মেসি। এই ছবি এখন সারাবিশ্বে সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত। কারণ, রোববার দিবাগত রাত ১টায় মুখোমুখি এই দুই ফুটবল যোদ্ধা। কিন্তু কে তুলেছিলেন তাদের সেই ছবি! তিনি বা মেসি কেউ কি জানতেন যে এই ছবি একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে! আইকনিক এ ছবির আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ত।
তিনি বিবিসি স্পোর্টকে জানান, ইউরো ২০২৪ চলাকালে ইয়ামালের বাবা ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার পর এক বন্ধুর কাছ থেকে ফোন পেয়ে তিনি জানতে পারেন, ছবির সেই শিশুটিই বর্তমানের লামিন ইয়ামাল। ইউরো ২০২৪-এ মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ইয়ামাল স্পেনকে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এতটাই কম বয়স ছিল যে, জার্মানির অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রম আইন নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছিল। মনফোর্তের স্মৃতিতে মেসি ছিলেন অত্যন্ত লাজুক ও অন্তর্মুখী। আর ছোট্ট ইয়ামাল ছিল হাসিখুশি। প্রাণবন্ত এক শিশু। আলোকচিত্রীর ভাষায়, শুরুতে পরিস্থিতি মেসির কাছে কিছুটা অচেনা হলেও তিনি খুব দ্রুতই সেটির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। এই ছবি ও আলোকচিত্রীকে নিয়ে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, কমিকসপ্রেমীরা ‘অরিজিন স্টোরি’ বা কোনো নায়কের যাত্রার সূচনাকাহিনির ধারণার সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত। আফগানিস্তানে অপহৃত না হলে টনি স্টার্ক কখনো ‘আয়রন ম্যান’ হয়ে উঠতেন না। আঙ্কেল বেনকে হারাতে না হলে পিটার পার্কার হয়তো কুস্তিগির হিসেবেই জীবন কাটাতেন। আর কানসাসে কেন্ট পরিবারের স্নেহে বড় না হলে সুপারম্যান হয়তো নিটশের কল্পিত সর্বশক্তিমান ‘উবারমেনশ’-এক নির্মম চরিত্রে পরিণত হতেন।
কিন্তু এসব কাল্পনিক সূচনাকাহিনিও রোববারের বিশ্বকাপ ফাইনালের নেপথ্যের বাস্তব গল্পটির সামনে ম্লান। সেই গল্পের শুরু বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুর অতিথি দলের ড্রেসিংরুমে। ২০০৭ সালে বার্সেলোনা, ইউনিসেফ এবং স্প্যানিশ দৈনিক স্পোর্ট-এর যৌথ উদ্যোগে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য ফটোশুটের আয়োজন করা হয়েছিল। লামিন ইয়ামালের পরিবার লটারিতে নির্বাচিত হওয়ায় তখন মাত্র পাঁচ মাসের শিশু ইয়ামালকে নিয়ে তারা সেই ফটোশুটে অংশ নেন। তখন ২০ বছর বয়সী লিওনেল মেসি ছিলেন উদীয়মান তারকা। ফটোশুটে তাকে শিশুটিকে প্লাস্টিকের একটি ছোট বাথটাবে গোসল করাতে এবং কোলে নিতে বলা হয়। ছবিগুলো তুলেছিলেন বার্সেলোনাভিত্তিক আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ত। মনফোর্ত জানান, মেসি স্বভাবতই লাজুক ছিলেন এবং প্রথমে শিশুটিকে কীভাবে ধরতে হবে সেটিও বুঝতে পারছিলেন না। পরিস্থিতিটি ছিল কিছুটা অস্বস্তিকর, তবে পরে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়।
ইতালীয় রেনেসাঁর খ্যাতিমান শিল্পী আন্দ্রেয়া দেল ভেরোক্কিও এবং তার তরুণ শিষ্য লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ‘দ্য ব্যাপটিজম অব ক্রাইস্ট’ চিত্রকর্মটি এ ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। ফুটবলের জগতে এর সমতুল্য বলা যেতে পারে আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্তের তোলা ওই ছবিকে। এর নাম হতে পারত ‘সেইন্ট মেসির হাতে শিশু ইয়ামালের দীক্ষা’। ২০০৭ সালে তোলা সেই ছবিটিই অপ্রত্যাশিতভাবে ভাইরাল হয়ে উঠেছে নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রোববারের বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই প্রধান তারকা লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালকে ঘিরে।
ইয়ামালের বয়স এখন ১৯, আর মেসির ৩৯। তাদের ২০ বছরের বয়সের ব্যবধান এমন যে, কার্লোস আলকারাজ ও ইয়ানিক সিনারের মতো সমসাময়িক টেনিস তারকারাও যেন নোভাক জোকোভিচেরই সমবয়সী বলে মনে হয়। কিন্তু সেই বিখ্যাত ছবিটি তোলা হলো কীভাবে?
বার্সেলোনা ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর একটি দাতব্য কর্মসূচির অংশ হিসেবে লটারির আয়োজন করা হতো। সেখানে নির্বাচিত একটি শিশুকে বার্সেলোনার মূল দলের একজন ফুটবলারের সঙ্গে পেশাদার ফটোশুটে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হতো। কাকতালীয়ভাবে সেই লটারিতে নির্বাচিত হন লামিন ইয়ামালের বাবা-মা, আর শিশুটি জুটি বাঁধে লিওনেল মেসির সঙ্গে। এরপরের গল্প এখন ফুটবল ইতিহাসেরই অংশ।
মেসি, ইয়ামাল এবং ফুটবল ইতিহাসের আরও অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড়কে গড়ে তোলার যে দর্শন, তার জন্ম ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রশিক্ষণকেন্দ্র লা মাসিয়াতে। ইংরেজিতে অর্থ ‘দ্য ফার্মহাউস’ বা ‘খামারবাড়ি’। ১৭০২ সালে নির্মিত একটি প্রাচীন কাতালান খামারবাড়িকে ১৯৭৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনা তাদের তরুণ ফুটবলারদের আবাসন ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত। ২০১০ সালে লা মাসিয়া ইতিহাস গড়ে। প্রথম কোনো যুব একাডেমি হিসেবে একই বছরে ব্যালন ডি’অরের প্রথম তিন স্থান অধিকারী- লিওনেল মেসি, জাভি এবং আঁন্দ্রে ইনিয়েস্তাকে গড়ে তোলার কৃতিত্ব অর্জন করে এটি। একই বছর স্পেন তাদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ জয় করে। সেই ফাইনালে স্পেনের শুরুর একাদশে ছিলেন বার্সেলোনার সাতজন খেলোয়াড়। তাদের ছয়জনই ছিলেন লা মাসিয়ারই সাবেক শিক্ষার্থী।
২০১১ সালে পুরোনো সেই খামারবাড়িতে খেলোয়াড়দের থাকা বন্ধ হয়ে যায়। তখন একাডেমির আবাসিকদের আরও আধুনিক ও বিলাসবহুল একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। তবে ততদিনে লা মাসিয়া কেবল একটি ভবনের নাম ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল একটি দর্শন- বার্সেলোনার পরিচয়ের মূল ভিত্তি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন ফুটবলার খুঁজে বের করা, গড়ে তোলা ও মূল দলে তুলে আনার ঐতিহ্যের প্রতীক।
লামিন ইয়ামালও বার্সেলোনার সেই লা মাসিয়ানির্ভর দর্শনে ফিরে আসার প্রতীক। বছরের পর বছর বেপরোয়া খরচের কারণে ক্লাবটি কার্যত দেউলিয়ার মুখে পড়ে এবং তাদের ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৫ কোটি ইউরো। সেই আর্থিক সংকটই ক্লাবকে আবার নিজেদের একাডেমির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য করে। এরই ফল হিসেবে এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দলের স্কোয়াডে লা মাসিয়ার নয়জন গ্র্যাজুয়েট রয়েছেন- স্পেন দলে আটজন এবং আর্জেন্টিনার হয়ে খেলছেন লিওনেল মেসি। তবে লা মাসিয়ার উদ্দেশ্য কখনোই আরেকজন মেসি, ইয়ামাল, জাভি বা ইনিয়েস্তা তৈরি করা ছিল না। বরং প্রত্যেককে একই ফুটবল দর্শনে শিক্ষিত করা হয়েছে- বল নিয়ন্ত্রণ, মাঠ পর্যবেক্ষণ, ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করা, সঠিক পাসিং অ্যাঙ্গেল তৈরি করা, মাঠের প্রস্থ কাজে লাগানো এবং খেলার জায়গা বা ‘স্পেস’-এর গুরুত্ব বোঝা।
অবাক করার মতো হলেও, লা মাসিয়ার ভিত্তি গড়ে উঠেছে এমন একটি ফুটবল দর্শনের ওপর, যার নাম টোটাল ফুটবল- যারা টেড লাসো সিরিজ দেখেছেন, তাদের কাছে শব্দটি পরিচিত লাগতে পারে। এই দর্শনটি নেদারল্যান্ডসের ক্লাব আজাক্স থেকে বার্সেলোনায় নিয়ে আসেন কিংবদন্তি কোচ রিনুস মিশেলস। দুই বছর পর তারই উত্তরসূরি হিসেবে বার্সেলোনায় যোগ দেন এই দর্শনের সবচেয়ে সফল অনুসারী ইয়োহান ক্রুইফ। টোটাল ফুটবলের মূল নীতি অত্যন্ত সহজ। খেলোয়াড়রা ম্যাচ চলাকালীন নিজেদের অবস্থান বা পজিশন পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু দলগত কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে। তাই প্রত্যেক ফুটবলারেরই একাধিক ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সমান দক্ষতা ও বোঝাপড়া থাকা জরুরি।
১৯৮৮ সালে ইয়োহান ক্রুইফ বার্সেলোনার কোচ হিসেবে ফিরে আসার পর তার গড়া ‘ড্রিম টিম’ টানা চারটি লা লিগা শিরোপা জেতে। পাশাপাশি ১৯৯২ সালে ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথম ইউরোপিয়ান কাপও জয় করে। ক্রুইফের দর্শনের মূল বিশ্বাস ছিল শারীরিক শক্তির চেয়ে কারিগরি দক্ষতা ও খেলার বুদ্ধিমত্তাই বেশি কার্যকর। তার সময়ে লা মাসিয়ায় খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে দ্রুতগতির শিশুদের অগ্রাধিকার না দিয়ে, বরং নির্দিষ্ট কৌশলগত ভূমিকা কতটা বুঝতে পারে, সেটিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। সেই একাডেমি থেকেই উঠে আসেন এক তরুণ মিডফিল্ডার- পেপ গার্দিওলা। তিনি একবার বলেছিলেন, ক্রুইফের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার যেন এক অসাধারণ চিত্রাঙ্কিত উপাসনালয়; পরবর্তী বার্সেলোনা কোচদের কাজ কেবল সেটিকে সংরক্ষণ করা কিংবা আরও উন্নত করা। পরে গার্দিওলা এই দর্শনকেই বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবল দর্শনে রূপ দেন। তবে সমালোচকদের মতে, পরবর্তীতে এই দর্শনকে কিছু কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নয়নের কৌশল বা ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছে।
যদি ক্রুইফকে স্বপ্নদ্রষ্টা বলা যায়, তবে লুইস ফন গাল ছিলেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কারিগর। একসময় তিনি বলেছিলেন, শুধুমাত্র নিজেদের একাডেমির ১১ জন খেলোয়াড় নিয়েই বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে পারে। সে সময় অনেকে এই বক্তব্য শুনে হাসাহাসি করেছিলেন। লেখকের ভাষায়, ক্রুইফ ছিলেন সূক্ষ্ম ও শৈল্পিক তরবারি, আর ফন গাল ছিলেন শক্তিশালী হাতুড়ি-একই লক্ষ্য অর্জনে ভিন্ন দুটি পন্থার প্রতীক। ফন গালও টোটাল ফুটবল দর্শনে বিশ্বাস করতেন। তবে তার সংস্করণে স্বাধীনতার চেয়ে শৃঙ্খলার গুরুত্ব ছিল বেশি। ক্রুইফ খেলোয়াড়দের সৃজনশীল স্বাধীনতা দিতেন, আর ফন গাল চাইতেন নিখুঁত নিয়মানুবর্তিতা। বার্সেলোনায় তার প্রথম মেয়াদে ক্লাব দুটি লা লিগা শিরোপা ও একটি কোপা দেল রে জেতে। একই সঙ্গে তিনি এমন এক কোচিং পরিবেশ তৈরি করেন, যাকে বৃটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান পরে ‘ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কোচিং সেমিনার’ বলে আখ্যায়িত করেছিল।
ফন গালের সেই ‘কোচিং সেমিনারে’ অংশ নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন পেপ গার্দিওলা, লুইস এনরিকে, ফিলিপ কোকু, ফ্রাঙ্ক ডি বোয়ার, জাভি এবং কার্লেস পুয়োল। বহু বছর পর জাভিই বার্সেলোনার প্রধান কোচ হিসেবে ফিরে এসে লামিন ইয়ামালকে মূল দলে অভিষেকের সুযোগ করে দেন। অন্যদিকে, হোসে মরিনহো প্রথমে বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছিলেন কোচ ববি রবসনের অনুবাদক ও সহকারী হিসেবে। পরে রবসনের উত্তরসূরি লুইস ফন গালও তাকে নিজের কোচিং স্টাফে রেখে দেন। নিজস্ব দর্শনে ফন গাল ছিলেন ক্রুইফের আদর্শ ও পরবর্তী সময়ে তার বিভিন্ন রূপান্তরের মাঝামাঝি অবস্থানে। পেপ গার্দিওলা হয়ে ওঠেন সেই দর্শনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ অনুসারী। পরে তিনি এই ফুটবল দর্শনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান, যা সমালোচকদের মতে কিছু কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে, মরিনহো হয়ে ওঠেন এই দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী।
সাধারণত একটি ফুটবল একাডেমির লক্ষ্য থাকে ভবিষ্যতে মূল দলে খেলতে পারবে-এমন খেলোয়াড় তৈরি করা। কিন্তু লা মাসিয়া, ফ্রান্সের ক্লেয়ারফঁতেন কিংবা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ক্যারিংটন একাডেমির মতো, সেই সীমা অতিক্রম করে অনেক বড় এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ২০০৮ সালের পর টানা এক দশক বার্সেলোনার সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল লা মাসিয়ায় বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়রাই। ২০১০ সালে বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের মূল কাঠামোও এসেছিল এই একাডেমি থেকে। শুধু তা-ই নয়, লা মাসিয়ার খেলোয়াড়, কোচ ও ফুটবল প্রশাসকদের মাধ্যমে এর দর্শন ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে এবং আধুনিক ফুটবলের এক ধরনের ‘সর্বজনীন ভাষায়’ পরিণত হয়। আর সেই দর্শনের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিনিধি ছিলেন পেপ গার্দিওলা। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে লা মাসিয়ার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এই সময় পেপ গার্দিওলা সের্হিও বুসকেতস ও পেদ্রোকে মূল দলে উন্নীত করেন, জেরার পিকেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে ফিরিয়ে আনেন এবং মাঝমাঠের কেন্দ্রে জাভি ও আঁন্দ্রে ইনিয়েস্তাকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই দলটিই পরে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা দল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২০০০ সালে লুইস ফন গাল যখন বলেছিলেন, বার্সেলোনা একদিন নিজেদের একাডেমির ১১ জন খেলোয়াড় নিয়েই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে পারবে, তখন তাকে ব্যাপক বিদ্রƒপের মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পর সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নেয়। বার্সেলোনা এমনভাবে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়েছিল-যে দলে তখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ওয়েন রুনি, কার্লোস তেভেজ, পল স্কোলস, রায়ান গিগস ও মাইকেল ক্যারিকের মতো তারকারা ছিলেন- যে দলটিকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো অপেশাদার রবিবারের লিগের দল।
এরপর ২০১০ সালে স্পেন বিশ্বকাপ জেতে। সেই ফাইনালে তাদের শুরুর একাদশে ছিলেন লা মাসিয়ার ছয়জন গ্র্যাজুয়েট। পরে গার্দিওলা তার ‘পজিশনাল প্লে’ দর্শন নিয়ে যান বায়ার্ন মিউনিখ এবং ম্যানচেস্টার সিটিতে। সিটিতে বার্সেলোনার সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা তার সঙ্গে মিলে এমন একটি ফুটবল কাঠামো গড়ে তোলেন, যা পরে শুধু মূল দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পুরো সিটি ফুটবল গ্রুপের দর্শনের অংশ হয়ে ওঠে।
ইতালির সাবেক স্ট্রাইকার লুকা টনি পরে মজা করে- যদিও কথাটির মধ্যে অনেকটাই সত্য ছিল- তিনি বলেছিলেন, গার্দিওলা ফুটবলকে এতটাই বদলে দিয়েছেন যে পুরোনো ধাঁচের খাঁটি সেন্টার-ফরোয়ার্ডদের জন্য আর তেমন কোনো জায়গাই অবশিষ্ট নেই। তবে লা মাসিয়া শুধু এই দর্শনের অনুসারীই তৈরি করেনি, এর সবচেয়ে বড় সমালোচকদেরও জন্ম দিয়েছে। তাদের একজন মিকেল আর্তেতা। মরিনহো যখন বার্সেলোনার মূল দলের কোচিং স্টাফে ছিলেন, তখন আর্তেতা লা মাসিয়ায় বেড়ে উঠছিলেন। যদিও লেখকের রসিক মন্তব্য অনুযায়ী, আর্তেতার অত্যন্ত রক্ষণাত্মক ও বাস্তববাদী কৌশল কখনো কখনো লা মাসিয়ার আদর্শের প্রতি এক ধরনের ‘ধর্মদ্রোহিতা’ বলেই মনে হতে পারে। আর এই দর্শনের সবচেয়ে বড় ‘ধর্মত্যাগী’ হলেন হোসে মরিনহো- যাকে লেখক রূপক অর্থে ‘বার্সেলোনার স্বর্গ থেকে নির্বাসিত বিশেষ ব্যক্তি (দ্য স্পেশাল ওয়ান)’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি পুরো কোচিং ক্যারিয়ারজুড়েই যেন টোটাল ফুটবল দর্শনকে পরাস্ত করার লড়াই চালিয়ে গেছেন।
হোসে মরিনহোর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ২০১০ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে। সেবার তার কোচিংয়ে থাকা ইন্টার মিলান বার্সেলোনাকে বিদায় করে ফাইনালে ওঠে। দ্বিতীয় লেগে ইন্টার প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ১০ জন খেলোয়াড় নিয়ে খেলেও মাত্র ১৪ শতাংশ বল দখলে রেখে টিকে ছিল। মেসিকে ঘিরে তারা এমন একটি ঘূর্ণায়মান রক্ষণাত্মক বলয় তৈরি করেছিল যে তিনি দুই লাইনের মাঝখানে স্বাভাবিকভাবে বলই গ্রহণ করতে পারেননি।
মেসি ও ইয়ামালকে খুঁজে পাওয়ার গল্প
তাহলে লা মাসিয়া কীভাবে মেসি বা ইয়ামালের মতো খেলোয়াড় খুঁজে পায়? মজার বিষয় হলো, দুজনের গল্প একেবারেই আলাদা। আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ ক্লাবে খেলার সময়, প্রায় ১০ বছর বয়সে মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। এই রোগের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ইনজেকশন নিতে হতো, যার ব্যয় বহন করা তার পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ১৩ বছর বয়সে ট্রায়ালের জন্য মেসিকে বার্সেলোনায় আনা হয়। সেখানে তিনি নিজের চেয়ে বয়সে বড় ডিফেন্ডারদেরও সহজেই পরাস্ত করে সবাইকে মুগ্ধ করেন। তবু ক্লাবের কর্মকর্তারা দ্বিধায় ছিলেন। কারণ একজন ইউরোপের বাইরের কিশোরকে দলে নেয়ার অর্থ ছিল তার ব্যয়বহুল চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া এবং পুরো পরিবারকে স্পেনে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা। শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনার তৎকালীন টেকনিক্যাল সেক্রেটারি কার্লেস রেক্সাক তাকে চুক্তিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, তিনি ক্লাবের প্রতিশ্রুতি একটি ন্যাপকিনের ওপর লিখেই লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ২০০১ সালে অত্যন্ত লাজুক স্বভাবের কিশোর হিসেবে মেসি বার্সেলোনায় যোগ দেন, আর ক্লাব তার চিকিৎসার ব্যয় বহনের দায়িত্বও গ্রহণ করে।
লামিন ইয়ামালের শৈশবও আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিল না। তিনিও একটি স্থানীয় ক্লাবে ফুটবল খেলা শুরু করেন। তার বাবা-মা ছিলেন মরক্কো ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির শ্রমজীবী অভিবাসী। ইয়ামাল বড় হয়েছেন বার্সেলোনার উপকণ্ঠের রোকাফোন্দা ও গ্রানোলিয়ার্স এলাকায়। তার পুরো নাম লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। এখানে ‘লামিন ইয়ামাল’-ই তার যৌথ প্রথম নাম। জন্মের আগে আর্থিক সংকটে পড়ে তার বাবা-মাকে বাড়িভাড়া দিতে সাহায্য করেছিলেন দুই ব্যক্তি। তাদের সম্মান জানাতেই সেই দুই নাম মিলিয়ে তার নাম রাখা হয় লামিন ইয়ামাল। বার্সেলোনার স্কাউট ইসিদ্রে গিল স্থানীয় ক্লাব সিএফ লা তোরেতার হয়ে খেলতে দেখে ইয়ামালকে প্রথম নজরে আনেন। ট্রায়ালের জন্য বার্সেলোনায় আসার দিন তার নিজের ফুটবল বুটও ছিল না। কিন্তু সেই ট্রায়ালই তার ভাগ্য বদলে দেয়। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি লা মাসিয়ায় যোগ দেন।
বছর কয়েক পর বার্সেলোনার প্রধান কোচ জাভি হার্নান্দেজ তাকে মূল দলের সঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ দেন। এরপর ২০২৩ সালের ২৯ এপ্রিল, মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেক করে ক্লাবের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রথম দলের খেলোয়াড় হওয়ার রেকর্ড গড়েন।
দুজনের মধ্যে তুলনা টানা হলেও, লিওনেল মেসি এবং লামিন ইয়ামাল আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ফুটবলার। শুধু তাই নয়, তারা যে বার্সেলোনা দলে যোগ দিয়েছিলেন, সেই দুই দলের বাস্তবতাও ছিল একেবারে আলাদা। কিন্তু ইয়ামাল যখন বার্সেলোনা ও স্পেনের মূল দলে আসেন, তখন শুরু থেকেই তাকেই দলের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
লিওনেল মেসির জন্য রোববারের বিশ্বকাপে সম্ভবত শেষ নৃত্য হতে পারে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের শেষ সুযোগ। আর লামিন ইয়ামালের জন্য এটি এমন এক যাত্রার শুরু, যেখানে ভবিষ্যতে আরও অনেকবার বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়ে নামার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপ জয়ের পর স্পেন প্রায়ই দীর্ঘ সময়ের জন্য শীর্ষ পর্যায় থেকে হারিয়ে যায়।
আর ছবিটির আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্তের জন্য- ঠিক আমাদের মতোই, যারা বার্সেলোনা বা স্পেনের সমর্থক না হলেও ফুটবলকে ভালোবাসি- এই ম্যাচে কাকে সমর্থন করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেয়া প্রায় অসম্ভব। বিবিসি স্পোর্টকে জোয়ান মনফোর্ত বলেন, আমার মনে হয়, আমরা তাদের গল্পের একটি পূর্ণচক্রের সমাপ্তি দেখতে যাচ্ছি। এটি যেন একটি সুখের সমাপ্তি। কিন্তু আমার হৃদয় যেন দুই টুকরো হয়ে যাচ্ছে। যে মানুষটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর কাকতালীয় ছবিটি ধারণ করেছিলেন, তার মতোই আমরাও এখন এক আবেগঘন অপেক্ষায়। সেই অমর দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী কে হবেন- হাসিখুশি সেই ছোট্ট শিশুটি, নাকি সেই চিরতরুণ, দেবদূতের মতো ফুটবলার, যিনি একদিন তাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন?
