২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ঢাকার আশুলিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন কারখানা শ্রমিক সাব্বির ইসলাম। তার মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পরও পরিবারটি দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে। নিজের কোনো ভিটেমাটি না থাকায় সাব্বিরের কবর হয়েছে অন্যের জমিতে। কয়েক মাসের বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় বাসা ছাড়তে হয়েছে পরিবারটিকে। এখন স্ত্রী ফরিদা আক্তার চার সন্তানকে নিয়ে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের বাড়িতে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অর্থাভাবে সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে।
বুধবার দুপুরে নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান গ্রামে সাব্বির ইসলামের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের পাওয়া যায়নি। সেখানে কথা হয় ফরিদা আক্তারের ভাই মো. চঞ্চল মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, জায়গার সংকট ও পারিবারিক সমস্যার কারণে তার বোন ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের ভাড়া বকেয়া থাকায় বাড়ির মালিক তাদের বাসা ছাড়তে বলেন। এরপর থেকে পরিবারটি বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে ঢাকার সাভারের আশুলিয়া এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হন সাব্বির ইসলাম। উদ্দেশ্য ছিল কাজের সন্ধানে যাওয়া এবং বাজার-সদাই নিয়ে ঘরে ফেরা। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংঘর্ষের মধ্যে তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাভারের বাইপাইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একটি গুলি তার ডান কানের পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়।
সাব্বির ইসলামের বাড়ি নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার লুনেশ্বর ইউনিয়নের খিলা বাউন্দি গ্রামে। তার বাবা মৃত শুকুর আলী। প্রায় দুই দশক আগে তিনি বানিয়াজান গ্রামের জামাল উদ্দিনের মেয়ে ফরিদা আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি এলাকায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে দিনমজুরিসহ বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরে জীবিকার তাগিদে আশুলিয়ায় গিয়ে একটি সরিষার তেলের কারখানায় চাকরি নেন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে সেখানেই ভাড়া বাসায় থাকতেন।
জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হলে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে পড়েন সাব্বির। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে ধারদেনা করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছিলেন। ৫ আগস্ট সকালে কাজের সন্ধানে বের হলেও আর ঘরে ফেরা হয়নি।
নিজেদের কোনো জমি না থাকায় তার মরদেহ বানিয়াজান গ্রামে অন্যের জমিতে দাফন করা হয়।
আটপাড়া উপজেলা সদরের একটি জরাজীর্ণ ঘরের বারান্দায় বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মানবজমিনকে ফরিদা আক্তার বলেন, আন্দোলনের সময় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের সংসার প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ধারদেনা করে চলছিলেন। সন্তানদের ক্ষুধা আর শিক্ষার্থীদের ওপর গুলির ঘটনা দেখে তার স্বামী আন্দোলনে যোগ দেন।
তিনি বলেন, “শেষবার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আমার স্বামী বলেছিল, ‘বাজার-সদাই নিয়ে আসব। কাজ না পেলে ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলন করে সরকার পতন ঘটিয়ে ঘরে ফিরব।’ সরকার পতন হয়েছে, কিন্তু আমার স্বামী আর ফিরে আসেনি।”
ফরিদা আক্তার বলেন, “চার সন্তান নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব? থাকার জায়গা নেই। ভাড়া দিতে না পারলে বাসা থেকে বের করে দেয়।”
পরিবারে তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। ১২ বছর বয়সী ছেলে মো. মমিন মিয়া বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বড় মেয়ে লিজা আক্তার অর্থাভাবে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। বাবার মৃত্যুর পর বাকি সন্তানদেরও লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে।
লিজা আক্তার বলেন, “বাবা চাইতেন আমি লেখাপড়া করে বড় মানুষ হই। এখন পড়াশোনা বন্ধ। থাকার জায়গা নেই। সময়মতো ভাড়া দিতে না পারলে বাসা থেকে বের করে দেয়। আমাদের খবর কেউ নেয় না।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আঙ্গুর মিয়া বলেন, “শহীদ সাব্বিরের পরিবার চরম মানবিক সংকটে আছে। সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দিয়ে একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়া উচিত। পাশাপাশি পরিবারটির চলার মতো স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থাও জরুরি। একজন শহীদের পরিবার এভাবে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরবে, এটা মেনে নেয়া যায় না।”
ফরিদার বড় ভাই চঞ্চল মিয়া জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর একজন অপরিচিত ব্যক্তি সাব্বিরের মুঠোফোন থেকে তাদের খবর দেন। পরে মরদেহ আটপাড়ায় এনে ৬ আগস্ট জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
তিনি বলেন, “সাব্বির খুবই নিরীহ মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যুর পর পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে। সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে সন্তানদের নিয়ে ফরিদা অন্তত স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারবেন।”
নেত্রকোণা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক ও এনসিপি নেতা ফাহিমুর রহমান খান পাঠান বলেন, “জুলাই আন্দোলনে শহীদ সাব্বির ইসলামের পরিবারকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য ছিল। বর্তমানে পরিবারটির মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই এবং আর্থিক অবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। এখন দেশে নির্বাচিত সরকার রয়েছে। তাই পরিবারটির স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।”
এ বিষয়ে আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ্নূর রহমান বলেন, “পরিবারটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছে। তাদের নিজস্ব জমি না থাকায় নীতিমালা অনুযায়ী খাসজমিসহ একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়ার চেষ্টা করা হবে।”
