সেমিফাইনালের মহারণে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা থেকে স্রেফ এক ম্যাচ দূরে স্পেন। ডালাসে মিকেল ওইয়ারজাবাল ও পেদ্রো পোরোর নিখুঁত লক্ষ্যভেদে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গেছে লা রোহারা। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর ডাগআউটে স্পেনের পুনরুত্থানের মূল কারিগর, কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ফাইনালের প্রতিপক্ষদের উদ্দেশ্যে এক হুঙ্কার ছেড়েছেন। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তার দল এখন নিজেদের ‘অজেয়’ মনে করছে।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সকেই ভাবা হচ্ছিল ট্রফির প্রধান দাবিদার। সেমিফাইনালের আগে ফরাসিদের আক্রমণভাগ টুর্নামেন্টে ১৬টি গোল করে। তবে টেক্সাসের আর্লিংটনে স্পেনের জমাট রক্ষণ আর নিখুঁত ফুটবলীয় কৌশলের সামনে ফরাসিদের সেই চেনা ধার উধাও হয়ে যায়। পুরো ম্যাচে ৮০ মিনিটের আগে গোলপোস্টে কোনো শটই রাখতে পারেনি ফ্রান্স। ম্যাচ শেষে নিজের শিষ্যদের প্রশংসায় ভাসিয়ে দে লা ফুয়েন্তে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এখন নিজেদের অপরাজেয় মনে করছি। ফ্রান্সের ফুটবলাররা জানত তারা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি দলের বিপক্ষে মাঠে নামছে। তবে তারা আসলে মুখোমুখি হয়েছিল এই মুহূর্তের বিশ্বের সেরা দলটির। আমাদের সেই বাড়তি আত্মবিশ্বাস ও ধারটা আছে। এই খেলোয়াড়রা সবকিছুর যোগ্য। কারণ দিনের পর দিন তারা মাঠে নিজেদের প্রতিশ্রুতি, উদারতা, সংহতি এবং প্রতিভা প্রমাণ করে চলেছে। ওদের খেলা দেখাটা এক পরম আনন্দ। আজকের ম্যাচটা ছিল একটা প্রদর্শনী। যা কিছু কঠিন, এই দলটা সেটাকেই সহজ বানিয়ে ছাড়ে।’
এই জয়ের ফলে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড ছুঁয়েছে ২০১০-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এর মাধ্যমে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ইতালির গড়া আন্তর্জাতিক ফুটবলের দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার ইউরোপিয়ান রেকর্ড স্পর্শ করলো তারা। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নবাগত কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে টুর্নামেন্ট শুরু করে স্পেন। সেই মন্থর শুরুর পর পর্তুগাল, বেলজিয়াম এবং সবশেষে ফ্রান্সকে যেভাবে তারা বিদায় করলো, তা স্প্যানিশ ফুটবলের এক রাজকীয় প্রত্যাবর্তন। দে লা ফুয়েন্তে মনে করেন, ১৬ বছর আগে ইকার ক্যাসিয়াসের নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় যে দলটা প্রথমবার বিশ্বজয় করেছিল, বর্তমান দলের ভেতর সেই একই আবহ কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আমি ড্রেসিংরুমে এক আনন্দঘন পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি এবং পুরো দেশ এখন আমাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ২০১০ সালের সেই বিশ্বজয়ের স্পিরিট আবার ফিরিয়ে এনেছি। এই দলের আসল চরিত্র বোঝা যায় একটা জিনিসে- যারা আজ মূল ম্যাচে খেলার সুযোগ পায়নি, তারাও ম্যাচ শেষ হওয়ার পর মাঠের পেছনে গিয়ে কঠোর অনুশীলন করেছে। এই দলটার উন্নতির কোনো শেষ নেই।’ দলে কোনো অহংকার বা ব্যক্তিগত ইগোর জায়গা নেই উল্লেখ করে স্প্যানিশ বস আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনার ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে আপনি কাদের বেছে নিচ্ছেন, তা জানা। যদি আপনি ভুল সঙ্গী নির্বাচন করেন, তবে আপনি সমস্যায় পড়বেন। আমাদের এই পুরো দলটা- শুধু খেলোয়াড়রা নয়, সঙ্গে থাকা প্রত্যেকে একটি সাধারণ লক্ষ্যের দিকে কাজ করছে। আমরা অত্যন্ত সাধারণ ও উদার মানুষ, যারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের আগে দলের ভালোটা চিন্তা করি।’
১৯শে জুলাই রোববারের মেগা ফাইনালে কোন দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চান, এমন প্রশ্নের জবাবে দে লা ফুয়েন্তে জানান আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির কথা।
তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কারণে তিনি ফাইনালে আলবিসেলেস্তেদেরই চান। তবে অন্য সেমিফাইনালের দুই দল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই ম্যাচটি নিজেই একটা বিশ্বকাপ ফাইনাল হওয়ার যোগ্য। আমি এটি বিশ্বাস করি না যে ফাইনাল ম্যাচ শুধু জেতার জন্যই। ফাইনাল ম্যাচ হলো উপভোগ করার জন্য। সামনে যা আসতে চলেছে, তা হয়তো আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রার কেকের ওপর একটা সুন্দর প্রলেপ মাত্র।’
