বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ফরাসিদের ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে ‘অপ্রতিরোধ্য স্পেন’। হাইভোল্টেজ ম্যাচে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যদের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের সামনে কুপোকাত ফ্রান্সের তারকাখচিত আক্রমণভাগ। বাংলাদেশের তারকা ফুটবলার তপু বর্মণ ম্যাচটিতে স্পেনের রণকৌশলই যে ফ্রান্সকে কুপোকাত করেছে, তেমনটিই বলেছেন। তিনি দলটির পারফরম্যান্স নিয়ে বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে ম্যাচের মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে স্পেনের হাই-প্রেসিং ফুটবল ও অসাধারণ বল পজেশন। তারা শুধু ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেনি, বরং তাদের দলগত প্রেসিং ও কাউন্টার-প্রেসিং ছিল দুর্দান্ত। স্পেন শুরু থেকেই ফ্রান্সের মূল আক্রমণভাগকে বোতলবন্দী করে রেখেছিল। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে কিংবা পরবর্তীতে নামা ব্র্যাডলি বারকোলাদের তারা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতেই দেয়নি।’ ফাইনালে প্রতিপক্ষ যেই আসুক (আর্জেন্টিনা কিংবা ইংল্যান্ড) তাদের ‘মাস্টারক্লাস’ কৌশল হবে ভীষণ চ্যালেঞ্জের।
স্পেন দলের মাঝমাঠ ও জমাট রক্ষণভাগের অসাধারণ পারফরম্যান্স নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তপু বলেন, ‘স্পেন মূলত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলেছে। যেখানে ডাবল-পিভট হিসেবে মাঝমাঠ সামলেছেন রদ্রি এবং ফাবিয়ান রুইজ। আর তাদের ঠিক সামনে ‘নাম্বার টেন’ পজিশনে অপারেট করেছেন দানি অলমো। গতকাল রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের বোঝাপড়া এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল এককথায় অসাধারণ। বিশেষ করে ‘অফ দ্য বল’ মুভমেন্টে তাদের পজিশনিং ও ফ্রান্সের পাসিং লেন ব্লক করার ক্ষমতা ছিল দেখার মতো। শুধু মিডফিল্ড নয়, তাদের ডিফেন্সিভ লাইনের চারজন পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, আইমেরিক লাপোর্ত, মার্ক কুকুরেয়া এই টুর্নামেন্টে নিজেদের অন্যতম সেরা প্রমাণ করেছেন। মাঠের প্রতিটি প্রান্তে তাদের এই দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’ স্পেনের দুর্দান্ত আক্রমণের সামনে ফ্রান্স বেশি সময় টিকতে পারেনি। আর ফরাসিদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করা স্পেনের এই গতিশীল রণকৌশল সম্পর্কে তপু বলেন, “ফ্রান্স মোটেও ঢিলেঢালা বা অতি-আত্মবিশ্বাসী ছিল না। মনে রাখতে হবে, স্পেন কিন্তু এর আগেও ফ্রান্সকে নেশনস লীগ ও ইউরোর মতো বড় মঞ্চে হারিয়েছে। ফ্রান্স গোল করে যেভাবে শুরুটা করতে চেয়েছিল, স্পেন খুব দ্রুতই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে ফরাসিদের সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়। এর পুরো কৃতিত্ব স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং তার শিষ্যদের। তারা ফ্রান্সকে এমন এক ‘আনকমফোর্টেবল জোনে’ ঠেলে দিয়েছিল যে, ফরাসি খেলোয়াড়রা পাসের পর পাস খেলেও কোনো ফাঁকফোকর খুঁজে পাচ্ছিল না।
স্পেনের গেম-প্ল্যান কাল মাঠে শতভাগ কাজ করেছে।” ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের গতকালের অত্যন্ত হতাশাজনক পারফরম্যান্স এবং স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের দুর্দান্ত রক্ষণকৌশল নিয়ে তপু বর্মণ বলেন, ‘একজন স্ট্রাইকার বা উইঙ্গার যখন প্রতিপক্ষের কড়া মার্কিংয়ের কারণে বল রিসিভ করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা পায় না, তখন মাঠে হতাশ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আর ফুটবল তো দলগত খেলা, একজন খেলোয়াড় তো আর প্রতি ম্যাচে একক নৈপুণ্যে গোল এনে দিতে পারবেন না। এমবাপ্পের ক্যারিয়ারের আগের বড় আসরের পারফরম্যান্স যদি দেখেন, তিনি কতটা ভয়ঙ্কর তা সবাই জানে। কিন্তু ফুটবলে যেকোনো বড় তারকারই একটা খারাপ দিন যেতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, এমবাপ্পের সেই খারাপ দিনটি গতকালই ছিল। আর স্পেনের রক্ষণভাগ তাকে যেভাবে বোতলবন্দী করে রেখেছিল, তার ক্রেডিট অবশ্যই স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের দিতে হবে।’ স্পেন এই টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রেকর্ড ৬টি ম্যাচে কোনো গোল না খাওয়ার অনন্য কীর্তি গড়েছে। ফুটবল ইতিহাসে এটি তাদের পুরুষ দলের দ্বিতীয় ফাইনাল। এর আগে তারা শুধু একবারই ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার স্পেনের ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে তপু বর্মণ বলেন, ‘স্পেন বর্তমানে যে ফর্মে আছে, তাতে যেকোনো দলের জন্যই তারা এক বিশাল আতঙ্কের নাম। তারা দলগত ফুটবলের যে প্রদর্শনী কাল দেখিয়েছে, তা সত্যিই অনন্য। দলের প্রতিটি খেলোয়াড় শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছে। ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনাÑ যারাই আসুক না কেন, স্পেনের এই টিকি-টাকা ও হাই-প্রেসিং ফুটবলের জবাব খুঁজে পাওয়া তাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হবে।’
