আলোচনায় মেটলাইফের ঘাস

ফাইনালের মাঠ নিয়ে শঙ্কা

আলোচনায় মেটলাইফের ঘাস

ফন্ট সাইজ:

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ম্যানহাটনের অদূরে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ফাইনালের আগে প্রশ্ন উঠেছে এ মাঠে থাকা ঘাসের মান নিয়ে। এবারের বিশ্বকাপের ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত মাঠেই হতে যাচ্ছে শিরোপা নির্ধারণী লড়াই। বিশ্বকাপের ১৬ ভেন্যুর চারটি ফুটবলের জন্যই তৈরি। এ ভেন্যুগুলো কানাডা ও মেক্সিকোর। যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি স্টেডিয়াম বহুমুখী ব্যবহারের জন্য নির্মিত।

এর মধ্যে মাত্র আটটি স্টেডিয়ামে সারা বছর প্রাকৃতিক ঘাস থাকে। বাকিগুলোতে ফিফার শর্ত পূরণে কৃত্রিম টার্ফের উপর সাময়িকভাবে ঘাস বসাতে হয়েছে। আবহাওয়া, উচ্চতা, সূর্যালোক এবং স্টেডিয়ামের কাঠামোর ভিন্নতার কারণে সব ভেন্যুতে একই রকম কন্ডিশন পাওয়া কঠিন। ৮৪টি অনুশীলন কেন্দ্র ও ১৭৮টি অনুশীলন মাঠ নিয়ন্ত্রণ করা বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। লস অ্যাঞ্জেলেসে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বেলজিয়াম তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিবর্তনের অনুরোধ করেছিল। কারণ প্রশিক্ষণের জন্য পাওয়া মাঠটি মান ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ড পূরণ করতে পারেনি। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বে সেনেগালের বিপক্ষে খেলেছিল ফ্রান্স। সেই ম্যাচে ৩-১ গোলে জয় পায় প্যারিসিয়ানরা। এরপরও মাঠ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ফরাসি মিডফিল্ডার আদ্রিয়েন রাবিও। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না এটাকে আদৌ মাঠ বলা যায় কি না। এটি অনেকটা কৃত্রিম টার্ফের মতো। বেশ শক্ত ও অনমনীয়।’ কোচ দিদিয়ের দেশমও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফাইনালের ভেন্যু সম্পর্কে দেশম বলেন, ‘এখানে ঘাসের নিচে হয়তো সিমেন্ট থাকতে পারে। এখানকার ঘাসের ব্লেডগুলো খুবই ছোট। প্লেয়ারদের জন্য মানিয়ে নেয়াটা চ্যালেঞ্জিং।’ মাঠ নিয়ে এই বির্তক নতুন নয়। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকাতেও মাঠের মান নিয়ে খেলোয়াড় ও কোচদের কাছ থেকে একাধিক অভিযোগ শোনা গেছে। গত বছরের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও একই সমস্যা দেখা গিয়েছিল। শার্লটের ব্যাংক অব আমেরিকা স্টেডিয়ামে রিয়াল মাদ্রিদের জয়ের পর জুড বেলিংহাম বলেছিলেন, ‘এখানকার মাঠগুলো ঠিকঠাক নয়, বল ঠিকমতো বাউন্স করে না। এটি হাঁটুর জন্য ক্ষতিকর।’

যুক্তরাষ্ট্রের মাঠ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও কানাডার ভ্যাঙ্কুভার প্রশংসা কুড়িয়েছে। তুরস্কের বিপক্ষে ২-০ গোলে জয়ের পর অস্ট্রেলিয়ান মিডফিল্ডার এইডেন ও’নিল ভ্যাঙ্কুভারের মাঠ নিয়ে বলেন, ‘তারা দুর্দান্ত কাজ করেছে, বল ঠিকঠাক গড়িয়েছে।’ ফিফার সিনিয়র পিচ ম্যানেজমেন্ট ম্যানেজার অ্যালান ফার্গুসনের নেতৃত্বে একটি মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প চলছে। তারা ইউনিভার্সিটি অফ টেনিসি এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করছেন। মাঠের মান যাচাইয়ে ফিফা ১৯টি নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। মাঠ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টার্ফকোচের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান থাইলের মতে, ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ মাঠের জন্য ফিফা অনেক চেষ্টা করলেও এটি মোটেই সহজ কাজ নয়। সাময়িক মাঠকে স্থায়ী মাঠের মতো আচরণ করানো অত্যন্ত কঠিন। ফিফার নিজস্ব পরীক্ষা পদ্ধতিতে মাঠের ১৯টি নির্দিষ্ট পয়েন্টে পরিমাপ নেয়া হলেও পুরো মাঠের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য তা যথেষ্ট নয়। আর পরিমাপের কয়েক মিনিট পরই সেচব্যবস্থা চালু হয়ে গেলে সেই তথ্যও পাল্টে যেতে পারে।’ উষ্ণ অঞ্চলে বারমুডা ঘাস ব্যবহৃত হয়। যা তাপ ও শুষ্কতা সহনশীল। আর তুলনামূলক ঠাণ্ডা বা ছাদযুক্ত মাঠে ব্যবহার করা হয় কেন্টাকি ব্লুগ্রাস ও রাইগ্রাসের মিশ্রণÑযা ইউরোপীয় ফুটবলের সঙ্গে বেশি পরিচিত। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্যবহৃত হয়েছে বারমুডা ঘাস। যা রাবিও বা দেশমের মতো ইউরোপীয় ফুটবলে অভ্যস্তদের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। নিউ জার্সিতে জুলাই মাসের প্রচণ্ড গরমে ঘাস দ্রুত শুকিয়ে যায়। যা বলের গতি ধীর করে দেয়। এসময় গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৮৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। স্থানীয় সময় বিকেল তিনটায় ফাইনাল শুরু হবে। যে কারণে মাঠ শুষ্ক থাকার সম্ভাবণাই বেশি। মরক্কো ম্যাচের পর এ মাঠ নিয়ে ব্রাজিল তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র জানান, ‘মাঠ শুকিয়ে গেলে ছন্দ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাকেনের কণ্ঠেও একই সুর। তিনি বলেন, ‘মাঠ শুকনো থাকলে বল পজিশন ধরে রাখা কঠিন।’ গবেষণায় দেখা গেছে, মাঠের ধরনের ওপর নির্ভর করে বলের গতি ও দূরত্বের তারতম্য ঘটে। মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামের পিচে বল যতটা দ্রুত গড়ায়, বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে তা নাও হতে পারে। এবারের বিশ্বকাপে অপ্রত্যাশিত ভুলের সংখ্যা ১২৩। যা ২০১৮ (৫১টি) ও ২০২২ (২২টি) বিশ্বকাপের চেয়ে অনেক বেশি।

দেখা গেছে, মাঠের মান বা বাউন্সের কারণে খেলোয়াড়রা বলের হিসাব মেলাতে পারেননি । সৌভাগ্যবশত, এখন পর্যন্ত মাঠের কারণে বড় কোনো ইনজুরির ঘটনা ঘটেনি। তবে টার্ফের ধরন ও গ্রিপের ওপর নির্ভর করে চোটের ঝুঁকি বাড়তে পারে। টার্ফকোচের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাঠের ধরন অনুযায়ী সঠিক বুট নির্বাচনও ইনজুরি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যা খেলোয়াড়ভেদে ভিন্ন হতে পারে তাদের পায়ের গঠন, চলাফেরার ধরন ও আগের ইনজুরির ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন