মাঠের লড়াইয়ে এতটা অসহায় আর নাজুক ফ্রান্সকে দেখেছেন কখনো? ম্যাচের আগে অপ্টার সুপারকম্পিউটারসহ বিভিন্ন পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণে স্পেনের চেয়ে এগিয়ে ছিল তারাই। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে সেই পূর্বাভাসের কোনো প্রতিফলন দেখা গেল না। বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতে। এ যেন ফ্রান্সের সপ্তমে চড়ে ভূপাতিত হওয়া। ফরাসি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণেও বলা হচ্ছে স্পেনের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের সামনে কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে দিদিয়ের দেশমের দল।
ফ্রান্সের প্রভাবশালী ক্রীড়া দৈনিক লেকিপ লিখেছে, স্পেন এমনভাবে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছে যে ফ্রান্স নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবলই খেলতে পারেনি! রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের নেতৃত্বে স্পেনের মিডফিল্ড বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে কিংবা ব্রাডলি বার্কোলারা আক্রমণে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। রক্ষণে মার্ক কুকুরেয়া ও পাউ কুবারসি অ্যানাকোন্ডার মতো পেঁচিয়ে রেখেছিলেন ফরাসি আক্রমণভাগকে। মাঝমাঠ থেকে যেক’টি বল স্পেনের অর্ধে পৌঁছেছিল সেগুলোকেও ভেতরে ঢুকতে দেননি তারা। এতে পুরো ম্যাচেই ফ্রান্স নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। কোচ দেশমের কোনো ‘প্ল্যান বি’ ছিল না যেটিতে খেলার মোড় ঘুরানো সম্ভব।
লা মন্দের-এর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে একই সুর। তাদের মতে, টুর্নামেন্টজুড়ে তুলনামূলক সহজ পথ পেরিয়ে আসায় ফ্রান্সের প্রকৃত সামর্থ্যের পরীক্ষা হয়নি। কিন্তু সেমিফাইনালে স্পেনের মতো বল দখলে দক্ষ ও সংগঠিত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েই সেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যায়। স্পেনের উচ্চ প্রেসিং, দ্রুত পাসিং এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণের সামনে ফ্রান্স বারবার দিশাহারা হয়ে পড়ে।
আরেক ফরাসি দৈনিক লা ফিগারো আবার ট্যাকটিক্যাল লড়াইয়ে দিদিয়ের দেশমের পরাজয়কেই সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখেছে। তাদের মতে, স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে শুরু থেকেই ম্যাচের পরিকল্পনায় এগিয়ে ছিলেন। স্পেন যেভাবে বল হারানোর পর মুহূর্তেই প্রেসিং করে পুনরুদ্ধার করেছে এবং ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে, তার কার্যকর কোনো প্রতিকার খুঁজে পাননি দেশম। ম্যাচের শুরুতেই হলুদ কার্ড দেখেন রাবিও। এছাড়া পূর্ণ ফিট না হওয়া সত্ত্বেও অরেলিয়েন চুয়ামেনিকে খেলানো হয়েছে। স্পেন এই জায়গায় টার্গেট করে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ম্যাচ শেষে দেশম নিজেও স্বীকার করেছেন যে ‘দ্বিতীয় সেরা’ ছিল তার দল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণও প্রায় একই। রয়টার্স জানায়, স্পেন পুরো ম্যাচে মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং ফ্রান্সকে তাদের পছন্দের ট্রানজিশন ফুটবল খেলতেই দেয়নি। এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) উল্লেখ করেছে, এই বিশ্বকাপে স্পেনের দুর্দান্ত রক্ষণভাগের ধারাবাহিকতার আরেকটি উদাহরণ ছিল এই ম্যাচ। এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের মতো তারকাদেরও তারা কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
৯০ মিনিটে গোলমুখে মাত্র তিনটি শট নিতে পেরেছেন এমবাপ্পে। যার একটিও অন-টার্গেটে ছিল না। ডিবক্সের ভেতর দু’বার ড্রিবল করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পজিশন হারিয়েছেন ১৩ বার। তিনবার পড়েন অফসাইড ফাঁদে। এমবাপ্পের কাছে বলের মূল জোগানদাতা ওলিসে প্রতিপক্ষের ডিবক্সের ভেতর একটিও পাস দিতে পারেননি। ২০ বার পজিশন হারান তিনি। আর উসমান দেম্বেলে স্পেনের অর্ধে মাত্র ৬৪ শতাংশ পাস কমপ্লিট করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে, স্পেনের মিডফিল্ডার ও রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা বেশিরভাগ ডুয়েলে জিতেছেন। রাইটব্যাক পেদ্রো পোরো তো দলের দ্বিতীয় গোলটিই করলেন।
ম্যাচ শেষে ফরাসি খেলোয়াড়দের মাঝেও দেখা গেছে আত্মসমালোচনা। অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে স্বীকার করেন, টেকনিক্যাল দিক থেকে তাদের পারফরম্যান্স প্রত্যাশার অনেক নিচে ছিল। সহজ পাস, প্রথম টাচ এবং বল নিয়ন্ত্রণে বারবার ভুল করায় স্পেনকে আক্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে ফ্রান্স। তরুণ ফরোয়ার্ড রায়ান চারকিও হারের জন্য কোনো অজুহাত খোঁজেননি। তার ভাষায়, স্পেনই ভালো দল ছিল এবং ফলাফল সেটিরই প্রতিফলন।
