আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়েছিল ফ্রান্স। কিন্তু যখনই আসল পরীক্ষা এলো, তখনই খেই হারিয়ে ফেললো ফরাসিরা। ডালাস স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালের মঞ্চে স্পেনের মাঝমাঠের আধিপত্য আর নিখুঁত কৌশলের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করলো কিলিয়ান এমবাপ্পেরা। মিকেল ওইয়ারজাবাল ও পেদ্রো পোরোর গোলে ফ্রান্সকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখলো স্পেন। আর এই হারের সঙ্গেই শেষ হলো ফরাসি ফুটবলের এক সোনালী অধ্যায়ের- বিদায় নিলেন ১৪ বছর ধরে দলের কোচের দায়িত্বে থাকা দিদিয়ের দেশম।
চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ছিল দুর্দান্ত ফর্মে। এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে আর মাইকেল ওলিসের পা থেকে আসে ১৩ গোল। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে তারা জালের দেখাতো পায়ইনি, উল্টো পুরো ম্যাচে শট নিতে পেরেছেন মাত্র ১০টি, যার মধ্যে অন-টার্গেট ছিল মাত্র ৩টি। ম্যাচ শেষে নিজের দলের ঘাটতি অকপটে স্বীকার করেন কোচ দিদিয়ের দেশম। তিনি বলেন, ‘ফাইনালে যাওয়ার আশা বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের সেরাটা দিতে হতো। দুর্ভাগ্যবশত, আজ আমরা সেটা পারিনি। স্পেন আজ দুর্দান্ত রক্ষণভাগ প্রদর্শন করেছে, আমাদের কোনো ফাঁকা জায়গাই দেয়নি। তার ওপর আমরা প্রচুর টেকনিক্যাল ভুল করেছি, যার ফলে ওদের রক্ষণে ফাটল ধরানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। আগের ম্যাচগুলোয় আমরা যে মানের ফুটবল খেলেছি, আজ আমাদের খেলার স্তর তার চেয়ে অনেক নিচে ছিল।’
ম্যাচের ২২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে স্পেনকে এগিয়ে নেন ওইয়ারজাবাল। এরপর ৫৮ মিনিটে দানি ওলমোর সহায়তায় ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো। লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যদের মাঝমাঠের আগ্রাসনের সামনে অরিলিয়ে চুয়ামেনি ও আদ্রিয়ে রাবিউরা পাত্তাই পাননি। মাঝমাঠের এই ব্যর্থতা নিয়ে ফরাসি অধিনায়ক এমবাপ্পে ম্যাচ শেষে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘মাঝমাঠে আমরা ওদের তিনজনের বিপক্ষে মাত্র দুজন ছিলাম, আর স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে এমনটা হলে ম্যাচ জেতা কঠিন। প্রেসিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের যোগাযোগের বড় অভাব ছিল। আমাদের উচিত ছিল ম্যান-টু-ম্যান প্রেসিং করা এবং ওদের দৌড়াতে বাধ্য করা। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে যখন আপনি যা করার কথা তা করতে পারবেন না, তখন আপনি জিতবেন না। স্পেন তাদের গেমপ্ল্যান ধরে রেখেছিল। ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে ওরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। আমরা বল পায়ে বড্ড এলোমেলো ছিলাম।’
ম্যাচে পরাজয়ের পর রেফারি ইভান আর্সিডেস বার্টন সিসনেরোর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিদায়ী ফরাসি কোচ। বিশেষ করে প্রথমার্ধে স্পেনের পাওয়া পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লামিন ইয়ামালকে লুকাস দিনিয়ে ফাউল করার আগে বলটি স্প্যানিশ তরুণ তুর্কির কনুইয়ে লেগেছিল বলে দাবি ফরাসি শিবিরের। দেশম বলেন, ‘আমি এখন কিছু বললে মনে হবে হেরে গিয়ে অজুহাত দেখাচ্ছি। কিন্তু আমি আপনাদের কাছেই প্রশ্ন রাখছি- এই রেফারি কি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পরিচালনার যোগ্য ছিলেন? শুধু পেনাল্টির সিদ্ধান্তই নয়, পুরো ম্যাচ জুড়েই এমন অনেক সিদ্ধান্ত ছিল। আমার ওনার প্রতি ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ নেই, তবে আপনারা নিজেরাই ভেবে দেখুন।
টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার কীর্তি গড়া হলো না ফ্রান্সের। তবে এই হারের ট্র্যাজেডির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে দিদিয়ের দেশমের বিদায়। ২০১২ সাল থেকে ফরাসি ডাগআউটের দায়িত্ব সামলানো দেশমের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই টুর্নামেন্টের পরেই। আগামী শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে ফরাসি কোচ হিসেবে তার ২৬তম এবং শেষ ম্যাচ। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে ডাগআউটে থাকার রেকর্ডও (২৬ ম্যাচ) নিজের করে নিলেন তিনি। খেলোয়াড় এবং কোচ- উভয় রূপেই ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ এনে দেয়া এই কিংবদন্তি বিদায়বেলায় আবেগি তবে গর্বিত কণ্ঠে বলেন, ‘এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার সময় নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেমিফাইনাল নাকি ফাইনাল থেকে বিদায় নিচ্ছি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফরাসি ফুটবলকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যেতে আমরা যা করেছি, তার জন্য আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। খেলোয়াড় হিসেবে আমি ভাগ্যবান ছিলাম, অনেক আনন্দের মুহূর্ত উপহার পেয়েছি। আজকের দিনটি হয়তো তেমন আনন্দের নয়, তবে যা কিছু অর্জন করেছি তা ভুলে না গিয়ে আমাদের এই পরাজয় মেনে নিতে হবে।’ দেশমের বিদায় নিয়ে দলের সাবেক স্ট্রাইকার অলিভিয়ে জিরু বলেন, ‘সব খেলোয়াড়ই চেয়েছিল দিদিয়েরকে একটা রাজকীয় বিদায় দিতে। তিনি বড় দরজা দিয়েই বিদায় নেয়ার যোগ্য ছিলেন। সেটা হয়তো পুরোপুরি হলো না। তবে গত ১৪ বছরে তিনি যা করেছেন, তার ট্র্যাক রেকর্ডই তার হয়ে কথা বলবে।’
গুঞ্জন রয়েছে, দেশমের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন তার ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থ জিনেদিন জিদান। তবে যিনিই আসুন না কেন, দেশমের রেখে যাওয়া বিশাল জুতোয় পা গলানো যে পরবর্তী কোচের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে, তা
বলাই বাহুল্য।
