বিশ্বকাপ ফাইনালে যখন স্পেনের হয়ে লামিনে ইয়ামাল মাঠে নামবেন তখন এই ম্যাচ দেখবেন হয়তো এমন দুজন মানুষও, যারা বার্সেলোনার এই তারকার জীবনের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও জনসম্মুখে তাদের আসল পরিচয় আজও এক রহস্য।
বেশিরভাগ স্প্যানিশ মানুষের মতোই দুটি পদবি রয়েছে দুই দিন আগে ১৯ বছরে পা রাখা ইয়ামালের। একটি বাবার কাছ থেকে পাওয়া, অন্যটি মায়ের কাছ থেকে। এই দুটি পদবি হলো নাসরাউই ও এবানা।
তবে সাবেক বার্সা কোচ শাভি কিংবা তার বর্তমান বার্সা সতীর্থ পেদ্রির মতো আরও অনেক স্প্যানিশ ফুটবলারের মতোই স্পেনের ১৯ নম্বর জার্সিধারী এই তারকা পেশাগতভাবে পরিচিত তার প্রথম নামেই। তবে এক্ষেত্রে বিশেষত্ব আছে। তার প্রথম নামটিই আসলে দুই অংশে গঠিত। অনেকটা পিএসজি কোচ লুইস এনরিকের নামের মতো। যিনি একসময় বার্সেলোনার কোচ ছিলেন। অনেকেই জানেন না, এই ফুটবল তারকার আসল নাম ‘লামিন ইয়ামাল’ নয়। এটি তার নামের প্রথমাংশ মাত্র। তার পুরো নাম লামিন ইয়ামাল নাসরাউই ইবানা। স্প্যানিশ ফুটবলারদের রীতি অনুযায়ী, তাদের নামের শেষে বাবা ও মায়ের পদবি যুক্ত থাকে। ইয়ামালের ক্ষেত্রেও তার বাবার নাম থেকে ‘নাসরাউই’ এবং মায়ের নাম থেকে ‘ইবানা’ যুক্ত হয়েছে। কিন্তু পেশাদার ফুটবলে তিনি পরিচিত তার প্রথম দুই নাম ‘লামিন ইয়ামাল’ হিসেবেই। স্পেন কিংবা বার্সেলোনাÑদুই দলের জার্সির পেছনেই এই নাম লেখা থাকে। কিন্তু তার পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রে পুরো নাম লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। আরবি ভাষায় ‘লামিনে’ একটি জনপ্রিয় নাম। যার অর্থ সৎ বা বিশ্বাসযোগ্য। এই নামের উৎপত্তি ‘আল আমিন’ থেকে। যা একসময় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে দেয়া একটি সম্মানসূচক উপাধিও ছিল। অন্যদিকে ‘ইয়ামাল’ শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত আরবি নাম ‘জামাল’-এরই একটি রূপভেদ। যার অর্থ সৌন্দর্য, লাবণ্য বা কমনীয়তা।
২০০৭ সালের জুলাই মাসে যখন লামিনের জন্ম হয়, তার মা শিলা ইবানা তখন মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী। সেই বয়সে সন্তান জন্ম দেয়া এবং অভাবের সংসারে নতুন এ দায়িত্ব নেয়া ছিল কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। সেই দুঃসময়ে ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই ও মা শিলার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যাদের একজনের নাম ছিল ‘লামিন’ এবং অন্যজনের ‘ইয়ামাল’। বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই নতুন বাবা-মা তাদের সন্তানের নাম রাখেন ‘লামিন ইয়ামাল’। তবে সেই দুই বন্ধুর পরিচয় আজও রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছে। তারা কে, বা ঠিক কী ধরনের সাহায্য করেছিলেন, তা কখনো প্রকাশ্যে আনেননি ইয়ামালের পরিবার। হয়তো তারা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। মাতারোর রোকাফন্ডা নামক এক অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় কেটেছে ইয়ামালের শৈশব। এলাকাটি স্পেনের অন্যতম দরিদ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ১২ বছর বয়সে কাতালান উপকূলের আরও দূরের নিজের বাড়ি ছেড়ে তিনি যোগ দেন বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমিতে। এরপর বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন লা লিগা শিরোপা। আর স্পেনের হয়ে জিতেছেন ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। ২০২৫ সালে বার্সায় তার চুক্তির মূল্য প্রায় ৪ কোটি ইউরো (৩ কোটি ৩৫ লাখ পাউন্ড; ৪ কোটি ৫৩ লাখ ডলার) ।
এর পাশাপাশি অ্যাডিডাস, আমেরিকান ঈগল, ভিসা, কোকাকোলা এবং বিটস বাই ড্রের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সঙ্গেও রয়েছে তার এনডোর্সমেন্ট চুক্তি। তারকা ইয়ামাল নিজের শেকড়কে ভুলে যাননি। গোল উদযাপনের সময় তিনি ‘৩০৪’ সংকেতটি দেখান, যা আসলে তাদের এলাকার পোস্টকোডের শেষ তিন ডিজিট। সম্প্রতি স্প্যানিশ রেডিও স্টেশন কাদেনাসেরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অতীতের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ইয়ামাল। তিনি বলেন, ‘আমার মা ১৬ বছর বয়সে আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। আমার বাবাকে পরিবারের খাবারের জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এটাই আমার কাছে আসল চাপ, মাঠের ফুটবলের চাপ তার কাছে কিছুই না।’
