হাওর অঞ্চলে পশু খাদ্য সংরক্ষণ: সম্ভাবনা ও সুযোগ

হাওর অঞ্চলে পশু খাদ্য সংরক্ষণ: সম্ভাবনা ও সুযোগ

ফন্ট সাইজ:

হাওর অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূপ্রাকৃতিক এলাকা, যা প্রায় ২০ লক্ষ হেক্টর (দেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪.০%) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। মূলত উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জেলা গুলোতে অবস্থিত এই অঞ্চলে চার শতাধিক বড় জলাভূমি রয়েছে। কৃষি, মৎস্যচাষ, পশুপালন এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হাওর কেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখা সত্ত্বেও হাওর অঞ্চলটি দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। কারণ বর্ষাকালে প্রায় ছয় মাস এটি জলমগ্ন থাকে।

হাওর এলাকার প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্যে রয়েছে মৌসুমি বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে একক ফসলভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা, বর্ষাকালে গবাদি পশুর খাদ্যের তীব্র সংকট, পশুখাদ্য বা গোখাদ্য চাষের জন্য সীমিত জমি, পশু খাদ্য ও ফসলের অবশিষ্টাংশ সংরক্ষণের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা, বর্ষাকালে দুর্বল পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক পশু খাদ্যের (দানাদার) উচ্চমূল্য ও সীমিত প্রাপ্যতা এবং আকস্মিক বন্যাসহ ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মাঠের ফসল নষ্ট করে দেয়।

এসব সীমাবদ্ধতার কারণে হাওর অঞ্চলে কৃষিকাজ মূলত শীতকালীন একটি ফসলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ধান এখানকার প্রধান ফসল। তবে লাভজনকতা ও অভিযোজন ক্ষমতার কারণে সম্প্রতি ভুট্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ফসল হয়ে উঠেছে। কোনো কোনে এলাকায় কৃষকরা আলু, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, পালং শাক, মুলা, লাউ ও মিষ্টি কুমড়ার মতো শীতকালীন শাকসবজিও চাষ করেন। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা ফসল উৎপাদনে পুরোদমে ব্যস্ত থাকেন এবং এই ফসলই তাঁদের আয়ের প্রধান উৎস।

হাওর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো গবাদি পশু পালন। শীতকালে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক ঘাস পাওয়া যায়, যা অনেক পরিবারকে গবাদি পশু পালনে উৎসাহিত করে। ফলে এ মৌসুমে গবাদি পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যা অন্য এলাকা থেকে আনা হয়। শীতকালে হাওর অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যান্য অংশের সাথে ভালোভাবে সংযুক্ত থাকে, যা কৃষিপণ্য ও গবাদি পশুর কেনাবেচাকে সহজতর করে তোলে। তাই শীতকাল সাধারণত কৃষক ও তাদের গবাদি পশু, উভয়ের জন্যই একটি উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ সময়।

চাষযোগ্য জমির বেশিরভাগ অংশ জুড়ে ধান চাষ হওয়ায় ফসল তোলার পর প্রচুর পরিমাণে ধানের খড় উৎপাদতি হয়। তবে বর্ষাকালে বসতবাড়িগুলোর চারপাশ বন্যার পানি থাকার কারনে খড় সংরক্ষণের জায়গা অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে ফলে কৃষকরা প্রায়শই তাদের খড়ের একটি বড় অংশ দেশের অন্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এছাড়া ধান উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা সেই খরচ পুষিয়ে নিতে দ্রুত খড় বিক্রি করে দেন। স্বল্পমেয়াদী আর্থিক সুবিধা পেলেও পরবর্তী বর্ষা মৌসুমে গবাদি পশুর খাদ্যের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুম শুরু হলে বন্যার পানিতে চারণভূমি তলিয়ে যায়, ফলে গবাদি পশুকে বাড়ির আঙ্গিনার মতো ছোট পরিসরে আবদ্ধ থাকতে হয়। এই সীমিত জায়গাতেই পরিবারের সদস্য, গবাদি পশুর থাকার ব্যবস্থা এবং গবাদি পশুর জন্য সংরক্ষিত খড়সহ সবসকিছুর স্থান সংকুলান করতে হয়। এর ফলে, কয়েক মাস ধরে মানুষ ও গবাদি পশু অত্যন্ত সংকীর্ণ পরিসরে বসবাস করতে বাধ্য হয়। এসময় মাঠে চরে বেড়ানোর কোনো সুযোগ থাকে না এবং কাঁচা ঘাসও পাওয়া যায়না। এছাড়া বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত দানাদর পশুখাদ্যেরও তীব্র সংকট দেখা দেয়। ফলে গবাদি পশু প্রায় পুরোপুরি ধানের খড়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

শুধুমাত্র ধানের খড় গবাদি পশুর পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে না। কারণ এতে হজমযোগ্য পুষ্টি উপাদান ও প্রোটিনের পরিমাণ অনেক কম থাকে এবং এতে প্রচুর পরিমাণে লিগনিন ও সিলিকা থাকে, যা খাদ্য হজমের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের ধানের ব্যাপক চাষাবাদের ফলে খড়ের গুণমান আরও কমে গেছে। এর ফলে গবাদি পশু ধীরে ধীরে ওজন হারাতে থাকে। ফলে বন্যা মৌসুমের শেষে কেবল অল্প কিছু অপুষ্টিতে ভোগা ও অসুস্থ গবাদি পশু অবশিষ্ট থাকে।

এই পরিস্থিতিটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, কারণ বাংলাদেশে এখনও মানসম্মত প্রাণিজ প্রোটিনের (যেমন দুধ, মাংস, ডিম) ঘাটতি রয়েছে। তাই হাওর অঞ্চলে গবাদি পশুর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা কেবল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার জন্যই নয়, বরং জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অপরিহার্য।

সংকর জাতের গবাদি পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গো খাদ্যের সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। কারন দেশি জাতের তুলনায় সংকর জাতের প্রাণীদের মাংস ও দুধ উৎপাদনে জিনগত সক্ষমতা বেশি। তবে এই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্য তাদের পুষ্টিসমৃদ্ধ সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। মানসম্মত গো খাদ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ছাড়া এসব প্রাণী তাদের প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতা প্রদর্শন করতে পারেনা। তাই সারা বছর, বিশেষ করে বর্ষাকালে, পুষ্টিকর গোখাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওর এলাকার জন্য যা অধিক প্রযোজ্য।

হাওরে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থাপনায় বন্যার সময় সবুজ পশুখাদ্য বা কাঁচা ঘাস প্রাপ্যতা অসম্ভব হলেও, পশুখাদ্য সংরক্ষণের প্রযুক্তিগুলো এর একটি কার্যকর সমাধান দিতে পারে। এই চ্যালেঞ্জটি বিবেচনায় নিয়ে, হাওর এলাকায় পশু খাদ্য সংরক্ষণের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং স্থানীয় কৃষকদের উপযোগী ব্যবহারিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ) একটি গবেষণার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কেজিএফ এর নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. নাথু রাম সরকার, জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সম্পদ) ড. মো. মনোয়ার করিম খান, জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (উদ্যান ফসল) ড. এম. নাজিরুল ইসলাম এবং জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (প্রাণিসম্পদ) ড. মো. এরশাদউজ্জামান গবেষণাটি সরাসরি তদারকি করেন।

গত তিন বছরে, এই প্রকল্পের আওতায় হাওর অঞ্চলের কৃষি জলবায়ু পরিস্থিতির সাথে মানানসই গোখাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের কৌশলগুলো নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভুট্টা এই অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ফসল। শুধু দানা বা বীজ উৎপাদনের জন্যই নয়, বরং সম্পূর্ণ গাছ গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্যও এটি একটি চমৎকার উৎস। সঠিক সময়ে (প্রায় ৯০ দিন বয়সে) সংগ্রহের মাধ্যমে উচ্চমানের গোখাদ্য পাওয়া সম্ভব। এরপর ভুট্টার সবুজ গাছ বা গোখাদ্য মাটির নিচের গর্ত করে বা পলিথিন ব্যাগে সাইলেজ হিসেবে সংরক্ষণ করা যায়, যার ফলে পুষ্টিগুণ ঠিক রেখে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।

চেলা ঘাস বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের একটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গুরুত্বপূর্ণ পশুখাদ্য ঘাস। এটি মৌসুমি জলাবদ্ধতা ও দীর্ঘস্থায়ী প্লাবন সহ্য করতে পারে এবং শুষ্ক মৌসুমে গবাদিপশুর জন্য নির্ভরযোগ্য সবুজ খাদ্য সরবরাহ করে। ঘাসটি সুস্বাদু, পুষ্টিগুণসম্পন্ন এবং গরু ও মহিষ সহজে গ্রহণ করে। বর্ষা মৌসুমে হাওরের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সবুজ ঘাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। এ কারণে শুষ্ক মৌসুমে চেলা ঘাস সংগ্রহ করে সাইলেজ তৈরি করলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। এই সাইলেজ বর্ষাকালে গবাদিপশুর পুষ্টির চাহিদা পূরণ, খাদ্য সংকট মোকাবিলা, দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং হাওর অঞ্চলের ক্ষুদ্র খামারিদের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর, মহিষারকান্দি ও উরিঅন্দ গ্রামের তিন শতাধিক কৃষকের কাছে শুরুতে সবুজ ভূট্টার গাছ থেকে সাইলেজ তৈরির সম্পূর্ণ নতুন ছিল। তবে গবাদি পশুর শারীরিক গঠন, স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব দেখে তারা সহজেই এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেন এবং সাইলেজ উৎপাদন অব্যাহত রাখার বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। আশাব্যঞ্জক ফলাফল সত্ত্বেও, বড় পরিসরে সাইলেজ উৎপাদন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা ও কারিগরি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, চপিং (কাটার যন্ত্র) ও কমপ্যাকশন (চাপ দিয়ে ঘন করার যন্ত্র) সরঞ্জামের অভাব, অবকাঠামোগত ব্যবস্থার অভাব, উন্নত মানের ভুট্টার বীজের অপ্রতুলতা, সংরক্ষণের উপকরণের ঘাটতি, প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ খরচ, ঋণ সুবিধার অপর্যাপ্ততা এবং শক্তিশালী সম্প্রসারণ সেবার প্রয়োজনীয়তা। গবাদি পশুর খাদ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের জন্য সরকারী সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই বাধাগুলো দূর করা অপরিহার্য।

কেজিএফ এর সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, হাওর অঞ্চলের গবাদি পশুর দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য সংকট সমাধানে ভূট্টার সাইলেজে একটি টেকসই উপায় হতে পারে। এই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে গবাদি পশুর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, মৌসুমি খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে সক্ষমতা অর্জন এবং জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রফেসর ড. খান মো সাইফুল ইসলাম
(প্রকল্পের প্রধান গবেষক)
এনিমেল নিউট্রিশন বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন