জাপান, সৌদি আরব, ইতালিতে ভারতের গার্মেন্টস রপ্তানি বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে

জাপান, সৌদি আরব, ইতালিতে ভারতের গার্মেন্টস রপ্তানি বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে

ফন্ট সাইজ:

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। জাপান, সৌদি আরব ও ইতালিতে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ভারতের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছে, যা রপ্তানিকারকদের মুনাফার ওপর চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনলাইন দ্য হিন্দু বিজনেস লাইন এ খবর দিয়েছে। অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিল (এইপিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল-ডিসেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি বছর থেকে বছরে ২.৪ শতাংশ বেড়ে ১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ৩ শতাংশ কমে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩.৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ কমেছে। এপ্রিল-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে জাপানে, ৩০ শতাংশ। একই সময়ে সৌদি আরবে রপ্তানি বেড়েছে ১৮.৫ শতাংশ এবং ইতালিতে ১৬ শতাংশ। ক্রাইসিল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক অনিকেত দানি বলেন, ২০২৫ সালের ২৭শে আগস্ট থেকে এ বছর ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক (২৫ ভাগ পারস্পরিক + ২৫ ভাগ দণ্ডমূলক) আরোপিত ছিল, যা ভারতীয় টেক্সটাইল শিল্পকে বড় অসুবিধায় ফেলে। তবে ৭ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি নির্বাহী আদেশে দণ্ডমূলক শুল্ক তুলে নেন, যা কিছুটা স্বস্তি দেয়।

তারপরও ভারত ২৫ শতাংশ শুল্ক বহন করছিল, যেখানে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম মাত্র ২০ শতাংশ শুল্ক সুবিধা পাচ্ছিল।
এই শুল্ক পরিবর্তনের কারণে রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা ধরে রাখতে মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের ১৫-১৮ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হয়েছে, ফলে মুনাফা সংকুচিত হয়েছে। তবে নতুন ১৫ শতাংশ সমান শুল্ক কাঠামো পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করবে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে, বিশেষ করে তিরুপ্পুর, পানিপথ ও সোলাপুরের মতো প্রধান উৎপাদন ক্লাস্টারে। দানি বলেন, সব দেশের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আগে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের উচ্চ শুল্কের কারণে প্রায় ১৫-১৮ শতাংশ ছাড় দিতে হতো। এখন ছাড় কমবে, ফলে চাপ কমবে। তিরুপ্পুর, পানিপথ ও সোলাপুর ক্লাস্টারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় সুবিধা পাবে।

‘ভারত এখন দৃঢ় অবস্থানে’

এইপিসি’র নির্বাহী কমিটির সদস্য সুধীর সেখরি মনে করেন, ভারত এখন আগের তুলনায় শক্ত অবস্থানে আছে। তিনি বলেন, আগে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। এখন ১৫ শতাংশ সমান শুল্ক কার্যকর হয়েছে, যা ভারতীয় সরবরাহকারীদের স্পষ্ট সুবিধা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে কাস্টমস ক্লিয়ার না হওয়া চালানগুলো নতুন হারের আওতায় পড়বে। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের চুক্তির ওপর নির্ভর করে কার্যকর শুল্ক ৬-১৭ শতাংশের মধ্যে হতে পারে। এছাড়া সংশোধিত কাঠামোর অধীনে আরও ৩-৪ শতাংশ অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, শুল্ক সমতা ফিরে আসায় ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্র ও উদীয়মান বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কাজে লাগাতে পারবে। বিশেষ করে শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন, ক্লাস্টার দক্ষতা ও দক্ষ শ্রমশক্তির মাধ্যমে।

চীনের সঙ্গে নতুন প্রতিযোগিতা

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক পরিবর্তনের ফলে ভারতীয় টেক্সটাইল শিল্পের বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের ওপর যে সামান্য সুবিধা ছিল, তা কমে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারত কার্যত চীনের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতায় নেমেছে। টেকনো স্পোর্টওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেডের (টিএসপিএল) সহপ্রতিষ্ঠাতা সুনীল ঝুনঝুনওয়ালা বলেন, তিন দিন আগেও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে ছিল। কিন্তু এখন চীনের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতায় রয়েছে। গত তিন মাস শিল্পে আলোচনা ছিল বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম নিয়ে। কিন্তু মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু চীন। তিনি আরও বলেন, চীনের ওপর ভারতের যে সুবিধা ছিল, তা গত দুই দিনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। শিল্পকে বড় পরিসরে যেতে হবে। বিশ্ব ক্রমেই চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

তবে সাপ্লাই চেইন, দক্ষতা ও বহুমুখিতায় ভারতের গভীরতা রয়েছে। আমাদের বড় ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে এবং উদীয়মান বাজারে মনোযোগ বাড়াতে হবে। চীনকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবেও দেখতে হবে। সব মিলিয়ে সীমিত প্রবৃদ্ধি ও শুল্ক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক নতুন প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টিকে থাকতে কৌশল, দক্ষতা ও ব্র্যান্ড শক্তিই হবে মূল চাবিকাঠি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন