‘গ্রেটার ইসরাইল’ গড়তে এবার সিরিয়ায় নজর

‘গ্রেটার ইসরাইল’ গড়তে এবার সিরিয়ায় নজর

ফন্ট সাইজ:

‘গ্রেটার ইসরাইল’ ধারণাকে সামনে রেখে এবার সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে স্থায়ী ইহুদি বসতি স্থাপনের দাবি জোরালো করছে একদল ইসরাইলি সেটলার। হালুতজেই হাবাশান বা ‘পাইওনিয়ার্স অব বাশান’ নামে পরিচিত এই সংগঠনটি গত এক বছরে প্রান্তিক একটি গোষ্ঠী থেকে ইসরাইলের ডানপন্থী রাজনীতির সমর্থনপুষ্ট একটি প্রভাবশালী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংগঠনটির কর্মীরা অধিকৃত গোলান মালভূমি ও দক্ষিণ সিরিয়ার মধ্যকার সীমান্তে জড়ো হন। কয়েকজন সীমান্তের বেড়ার সঙ্গে নিজেদের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলেন, আর অন্তত ১০ জন সীমান্ত অতিক্রম করে হারমন পর্বতের (জাবাল আল-শেখ) পাদদেশে মাজদাল শামসের কাছে সিরিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। পরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, সীমান্ত অতিক্রমকারী বেসামরিক ব্যক্তিদের ফিরিয়ে এনে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে সংগঠনটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের অংশ বলেই তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্য, ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতি রেখার ওপারেও ইহুদি বসতি স্থাপনের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

কী এই ‘পাইওনিয়ার্স অব বাশান’
২০২৫ সালের এপ্রিলে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। কয়েক মাস আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ সিরিয়ার কিছু এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করে। সেই প্রেক্ষাপটেই সংগঠনটির উত্থান।
‘বাশান’ নামটি নেয়া হয়েছে বাইবেলে উল্লেখিত একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল থেকে, যা জর্ডান নদীর পূর্বে হারমন পর্বত থেকে গিলিয়াদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

‘গ্রেটার ইসরাইল’ মতবাদের অনুসারীদের বিশ্বাস, ইসরাইলের কোনো চূড়ান্ত সীমান্ত নেই। ধর্মীয় জায়নবাদীদের একটি অংশ মনে করে, বাইবেলে প্রতিশ্রুত ভূখণ্ড মিসরের নীল নদ থেকে ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত, উত্তরে তুরস্কের হাতায় এবং দক্ষিণে সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই মতাদর্শ অনুযায়ী, দক্ষিণ সিরিয়াকে তারা বিদেশি ভূখণ্ড নয়, বরং পূর্বপুরুষদের ঐতিহাসিক আবাসভূমির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

বিতর্কিত বক্তব্য
ওপেন-সোর্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক মুরাদ মোহাম্মদ আল-হামউইর মতে, সংগঠনটির সদস্যরা নতুন হলেও অনভিজ্ঞ নন। তিনি বলেন, এরা অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গোলান মালভূমির অভিজ্ঞ সেটলার। তাদের লক্ষ্য দক্ষিণ সিরিয়ায় স্থায়ী ইহুদি বসতি গড়ে তোলা।
তিনি আরও বলেন, সংগঠনটির কিছু প্রকাশ্য বক্তব্য স্থানীয় জনগণের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের আহ্বানের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এপ্রিল মাসে সংগঠনটির ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়, বাশান অঞ্চল থেকে সব সুন্নি ও শিয়া মুসলিমকে বহিষ্কার করতে হবে। পোস্টে বলা হয়, ইসরাইলি শাসনের অধীনেই কেবল বাশান অঞ্চল সমৃদ্ধ হতে পারে।

কারা দিচ্ছেন নেতৃত্ব?
সংগঠনটির প্রধান মুখ আমোস আজারিয়া। তিনি একজন ইসরাইলি শিক্ষাবিদ, ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী কর্মী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসরাইলি সীমান্তের বাইরে ইহুদি বসতি স্থাপনের দীর্ঘদিনের সমর্থক।
আজারিয়ার মতে, দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতির পর সেখানে স্থায়ী বেসামরিক ইহুদি বসতি গড়ে তোলা উচিত। তার ভাষায়, এটি যেমন নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন, তেমনি বাইবেলীয় উত্তরাধিকারের অংশ।
তিনি একই সঙ্গে উরি তজাফোন নামে আরেকটি উগ্র ডানপন্থী সংগঠনেরও অন্যতম নেতা। এই সংগঠনটি দক্ষিণ লেবাননে ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে প্রচার চালায়।

সংগঠনের মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারী জোনাথন লেভি দাবি করেন, সিরিয়ার বর্তমান সরকারের অধীনে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে স্থায়ী ইহুদি বসতি স্থাপন।

রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ছে
শুরুর দিকে প্রান্তিক সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন সংগঠনটি ইসরাইলের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের প্রকাশ্য সমর্থন পাচ্ছে।

২০২৬ সালের শুরুতে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে “ট্রিবিউট টু দ্য পাইওনিয়ার্স অব সেটেলমেন্ট” শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে হালুতজেই হাবাশান এবং এর প্রতিষ্ঠাতা আমোস আজারিয়াকে বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয়।
এই সম্মাননাপত্রে স্বাক্ষর করেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই সেটলার আন্দোলনের অন্যতম প্রবল সমর্থক।

এ ছাড়া প্রবাসবিষয়ক মন্ত্রী আমিখাই চিকলি প্রকাশ্যে বলেন, এটি আমাদের ভূমি। বাশানে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগমন্ত্রী শ্লোমো কারহির সঙ্গেও আজারিয়ার বৈঠক হয়েছে। সেখানে বাশান অঞ্চলে ইসরায়েলি মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

লিকুদ দলের সংসদ সদস্য এরিয়েল কালনারও এই আন্দোলনের সমর্থনে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তার ভাষায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় বসতি স্থাপনের মাধ্যমে।

একাধিক সীমান্তে সমন্বিত বসতি আন্দোলন
হালুতজেই হাবাশানের সঙ্গে গাজায় পুনরায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে কাজ করা নাহালা এবং দক্ষিণ লেবাননে বসতি স্থাপনের পক্ষে থাকা উরি তজাফোন সংগঠনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দখল বা নিয়ন্ত্রণে আসা বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপনের লক্ষ্যে এসব সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় ক্রমেই বাড়ছে।

ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ

সংগঠনটি ধাপে ধাপে সীমান্ত অতিক্রমের কৌশল অনুসরণ করছে। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো তারা সিরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করে “বাশান ওএসিস” নামে একটি বসতি স্থাপনের চেষ্টা করে। এরপর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরজুড়ে একাধিকবার সীমান্ত ভাঙার চেষ্টা চালানো হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার ভেতরে “বাশান নেচার রিজার্ভ” নামে একটি নতুন বসতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানও করে তারা।

এপ্রিল মাসে মাজদাল শামসের কাছে সীমান্তের বেড়া ভেঙে কয়েকশ মিটার ভেতরে প্রবেশ করে সংগঠনটির সদস্যরা। ১৭ মে তারা আবারও সীমান্তে বিক্ষোভ করে এবং বসতি স্থাপনের অনুমতি দাবি জানায়।

স্থানীয়দের উদ্বেগ
বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকার দক্ষিণাঞ্চলে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই নিরাপত্তা শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী ও সেটলার সংগঠনগুলো।

মুরাদ আল-হামউই বলেন, এখন পর্যন্ত সংগঠনটির সদস্যরা নিরস্ত্র অবস্থায় সীমান্ত অতিক্রম করছে, যাতে বিষয়টিকে সামরিক নয়, বেসামরিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তারা যখন সিরিয়ার জনবসতিপূর্ণ এলাকার আরও কাছে পৌঁছাবে, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠবে।

২৮ জুন দারা প্রদেশের আবদিন গ্রামে ইসরাইলি বাহিনীর হেলিকপ্টার ও গোলন্দাজ সহায়তায় অভিযানের পর স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন। তারা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ফেলে সড়ক অবরোধ করে ইসরাইলি সামরিক যানবাহনের অগ্রগতি ঠেকানোর চেষ্টা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ সিরিয়ায় বসতি স্থাপনের এই আন্দোলন কেবল সীমান্ত রাজনীতির বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতে অঞ্চলটির নিরাপত্তা, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য এবং ইসরায়েল-সিরিয়া সম্পর্কের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন