বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার সশস্ত্র বাহিনীর ১৫০ জন কর্মকর্তাকে পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই তালিকায় ১১৫ জন সেনাবাহিনীর, ২১ জন নৌবাহিনীর এবং ১৪ জন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা রয়েছেন। সম্প্রতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর চাকরিতে বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত (চাকরিচ্যুত) অফিসারদের আবেদন পর্যালোচনাপূর্বক সুপারিশ পেশের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটি এবং বাহিনী সদর দপ্তরসমূহ কর্তৃক গঠিত পর্ষদসমূহ প্রণীত প্রস্তাব ও সুপারিশসমূহ বিস্তারিত পরীক্ষা ও পর্যালোচনাপূর্বক সুপারিশ প্রদানের জন্য (০৩ মে ২০২৬ তারিখের ২৩.০০.০০০০.১৮০.১৩.১৫৬.২২.৩২২ নম্বর স্মারকে) গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২১ জন ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ১৪ জন- সর্বমোট ১৫০ জন অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত (চাকরিচ্যুত) অফিসারদের তাদের নামের পার্শ্বে উল্লিখিত তারিখে স্বাভাবিক অবসর/ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিসহ স্বাভাবিক অবসর/অকালীন (বাধ্যতামূলক) অবসর/পদোন্নতি প্রদান এবং তদনুযায়ী বিধি মোতাবেক বকেয়া বেতন, ভাতা এবং আর্থিক ও আনুষঙ্গিক সুবিধা (যার জন্য যেটি প্রযোজ্য-বিশেষ আর্থিক/প্রণোদনা) প্রদানের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে সরকারি আদেশ জারি করা হলো। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশটি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। একইসঙ্গে, চলতি বছরের ৫ই ফেব্রুয়ারি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা এ-সংক্রান্ত আগের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১২ই মার্চ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো বিএ-১৩০৮ লে. জেনারেল মোহাম্মদ আমিনুল করিমকে বয়সসীমা শেষে স্বাভাবিক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ৩০শে জুন ২০১২ পর্যন্ত লে. জেনারেল পদে বকেয়া বেতন, ভাতা এবং বিধি মোতাবেক আর্থিক ও আনুষঙ্গিক সুবিধা প্রাপ্ত হবেন। ২০১০ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো বিএ-১৫৫৫ লে. জেনারেল সিনা ইবনে জামীলকে বয়সসীমা শেষে স্বাভাবিক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে ২০১৪ সালের ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত লে. জেনারেল পদে বকেয়া বেতন, ভাতা এবং বিধি মোতাবেক আর্থিক ও আনুষঙ্গিক সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন।
একইভাবে বিএ-১৫৫৯ মেজর জেনারেল মুহাম্মদ ইশতিয়াক, মেজর জেনারেল মো. সফিকুল ইসলাম, মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ রুহুল আমিন, মেজর জেনারেল নিজাম আহমেদ, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, মোজর জেনারেল মো. নাঈম আশফাক চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইমাম হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাবিবুর রহমান মোহাম্মদ রোকন উদ্দীন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বদরুল মিল্লাত ভুঁইয়া, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আনিসুজ্জামান ভুঁইয়াসমহ মোট ১৫০ কর্মকর্তাকে ভুতাপেক্ষ পদোন্নতিসহ স্বাভাবিক অবসর ও বকেয়া বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, সেনাবাহিনী দেশের কোনো দলের না। আমার মনে হয়, রাজনীতিবিদরা যদি এটা বোঝে, আলহামদুলিল্লাহ। সেনাবাহিনী তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছবে। সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ৮ বছর আয়নাঘরে আটকে রেখে আল্লাহ আমাকে ফিরিয়েছে। আমার কষ্ট হয়েছে। এই কষ্ট তো হাজার কোটি টাকা দিয়েও দূর করা যাবে না। তারপরও আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে আহ্বান করা যেতে পারে, যারা বঞ্চিত এখনও আছে, তারা দরখাস্ত করলে প্রতিটি কেস খতিয়ে দেখা উচিত, সে সত্যিকারে বঞ্চিত হয়েছে কি না। যদি হয়, তাকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেয়া উচিত। কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, আমরা চাই এ ধরনে অপকর্ম যাতে আগামীতে না হয়। রাষ্ট্রের ক্ষতি, ব্যক্তির ক্ষতি। আমরা নতুন অধ্যায়ে চলে এসেছি, আর যেন এই কালো অধ্যায় না থাকে। কেউ অপরাধ করলে অন্যদের দায়িত্ব হলো প্রতিরোধ করা, যাতে অপরাধ না করে। আমরা এই কালচারে না এলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারব না।
উল্লেখ্য, বিগত সরকারের আমলে বৈষম্য ও প্রতিহিংসার শিকারের ঘটনা ছিল অহরহ। বাদ যায়নি সশস্ত্র বাহিনীও। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পরই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া কর্মকর্তারা প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত তিন বাহিনীতে চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাহিনী সদর দপ্তর পৃথকভাবে পর্ষদ গঠন করে। পরে গত ৩ মে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সংশ্লিষ্ট আবেদন, প্রস্তাব ও সুপারিশ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ দেয়।
