আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য যে হুমকি সৃষ্টি করছে বলে ওয়াশিংটনের দাবি, তা মোকাবিলায় আদালতটিকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। সোমবার এ কথা জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ওয়াশিংটনের আরও অনেক নেতা, যেমন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে- আইসিসির কোনো এখতিয়ার থাকা উচিত নয় যাতে তারা মার্কিন নাগরিকদের, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা বিচার করতে পারে।
রয়টার্স জানতে পেরেছে, ভবিষ্যতে বিদেশে মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য ট্রাম্প বা তার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার যেকোনো সম্ভাব্য উদ্যোগ ঠেকাতেই আইসিসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপকে সমর্থন দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সোমবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় রুবিও বলেন, আইসিসি মূলত সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার করার জন্য গঠিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক বেশি উগ্র ও চরমপন্থী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন কখনোই আইসিসিকে মার্কিন কর্মকর্তা বা কর্মীদের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে দেবে না।
আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, আইসিসিকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ভিসা বাতিল, আইসিসি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য দেশকে আইসিসি থেকে বেরিয়ে আসতে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে বলেছে, আমেরিকানদের জন্য আইসিসির যে হুমকি রয়েছে, তা ভেঙে দিতে আমাদের অভিযানে কোনো কূটনৈতিক বিকল্পই বাদ থাকবে না। এ বিষয়ে আইসিসির মুখপাত্র ওরিয়েন মাইয়ে বলেন, এই মুহূর্তে আদালত এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না।
আইসিসি কী?
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০০২ সালে আইসিসি প্রতিষ্ঠা করে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য। কোনো সদস্য রাষ্ট্র নিজে এসব অপরাধের বিচার করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হলে আইসিসি বিচারিক এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই আইসিসির সদস্য হয়নি। তবে আইসিসির বিধি অনুযায়ী, কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সদস্য নয় এমন দেশের নাগরিকদের দ্বারা সংঘটিত নৃশংস অপরাধের বিচার করার ক্ষমতাও আদালতের রয়েছে।
ট্রাম্পের পুরোনো বিরোধিতা
আইসিসির প্রতি ট্রাম্পের বিরোধিতা তার প্রথম মেয়াদ থেকেই চলে আসছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর, যখন আইসিসি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, তখন আইসিসির কর্মকর্তাদের শাস্তি দেয়ার পরিকল্পনা আবারও সামনে আসে। গত মাসে আইসিসির তিন বিচারক ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাদের অভিযোগ, গত বছর তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বেআইনি ছিল।
কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে সোমবার প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে রুবিও বলেন, কিছু অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন গোষ্ঠী ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসী বহিষ্কার অভিযান কিংবা মাদক বহনকারী বলে সন্দেহভাজন নৌযানে মার্কিন হামলার ঘটনায় মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসিতে মামলা করার আহ্বান জানিয়েছে। ভিডিও বার্তায় রুবিও বলেন, এই মুহূর্তে আইসিসি এবং তাদের সহযোগীরা গুলি বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়, বরং আইন, চুক্তি এবং তথাকথিত আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, সীমান্ত টহল বাহিনীর সদস্য, মেরিন সেনা এবং সন্ত্রাসবাদবিষয়ক মামলার প্রসিকিউটররাও ভবিষ্যতে আইসিসির বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন। তবে বাস্তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইসিসি মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত শুরু করেনি। ২০২০ সালের মার্চে আইসিসির প্রসিকিউটররা আফগানিস্তানে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করেছিলেন, যেখানে মার্কিন সেনাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার বিষয়ও ছিল। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে সেই তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার গুরুত্ব কমিয়ে আফগান সরকার এবং তালেবান বাহিনীর কথিত অপরাধের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
মিত্র দেশগুলোকেও চাপ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, রুবিও এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন, যাতে তারা আইসিসিকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করে এবং মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে আদালতটি কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগী, মার্কিন সামরিক ঘাঁটির আতিথ্য দেয় অথবা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার সুবিধা পায়, তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে যেন তারা মার্কিন কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যদের বিচার করার আইসিসির দাবিকৃত এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করে। তিনি আরও বলেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নেয়ার পরও আইসিসির অবস্থান প্রত্যাখ্যান করবে না, তাদের ওপর ওয়াশিংটন আরও কঠোর নজরদারি চালাবে। শেষে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমেরিকানদের এই হুমকির বিরুদ্ধে কোন কোন দেশ আমাদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, তা আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করব।
