সামিউল হাসান শুভ (৩৩)। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। নানা পারিপার্শ্বিকতায় গোপনে মাদকে জড়িয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা কেউ জানতো না। আস্তে আস্তে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। সন্দেহ, ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে ফেলে। পরিবারের সদস্যরা তাকে মানসিক ডাক্তারের কাছে নেয়। চিকিৎসা চলে। রোগীর অগ্রগতি তেমন একটা হয় না। পরে চিকিৎসার স্বার্থে মাদকমুক্ত পরিবেশে রাখার পরামর্শ দেয়া হয় চিকিৎসকের পক্ষ থেকে। সে অনুযায়ী শুভকে বগুড়ার মায়ের আশ্রয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করানো হয় গত ১৩ ফেব্রুয়ারি। সেখানে ভালোই ছিল। হঠাৎ ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে শুভ। ওইদিন রাতে তাকে বগুড়ার জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয় মায়ের আশ্রয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। সেখানকার ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার শরীরে বিদঘুটে রকমের জখমের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়। ফলে তার মৃত্যুতে নানা প্রশ্ন সামনে হাজির হয়েছে। শুভকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে মারধর করা হয়েছে কিনা অথবা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের বাইরে কোনো ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে কিনা এমন সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
ঘটনার রাতে আবু তালহা নামের একজন মিডিয়াতে ভিডিও বক্তব্যে নিজেকে ওই মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের ডিউটি ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেছে ওইদিন সকালে শুভকে ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। দুপুর, বিকাল পর্যন্তও শুভ স্বাভাবিক ছিল। তাকে খাবার খাওয়ানো যায়নি। সন্ধ্যার পরে তার শরীরে কোনো সাড়া না পাওয়ায় হাসপাতালে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই ডিউটি ডাক্তার সকালে ওষুধ খাওয়ানোর কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন কিন্তু ডাক্তার আজিজুল হাকিম বাপ্পার প্রেসক্রিপশনে সকালের কোনো ওষুধই ছিল না। তাহলে ওই ডিউটি ডাক্তার তাকে কি প্রেসক্রিপশনের বাইরে কোনো ওষুধ খাইয়েছেন যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শুভর মৃত্যু হতে পারে? আবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপ-পরিচালক মোহা. জিল্লুর রহমান বলেন, আবাসিক ডাক্তার পরিচয়দানকারী তালহা এমবিবিএস পাস করা একজন ডাক্তার তবে তিনি রেজিঃভুক্ত নন। ওই ডাক্তার নিজেও একজন মাদকাসক্ত। ওই নিরাময় কেন্দ্রের একজন রোগী। বর্তমানে তিনি ফলোআপ রোগী হিসেবে ওখানে আছেন। তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক মানুষ নন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপ-পরিচালক মোহা. জিল্লুর রহমানের এমন তথ্যে বিষয়টা আরও অন্ধকারে চলে যায়। তালহা নিজে মাদকাসক্ত রোগী হয়ে কীভাবে অন্য রোগীদের চিকিৎসা সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন। তালহা আসলে কি হিসেবে মায়ের আশ্রয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে আছেন সে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার জন্য কথা হয় নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক পলিন হাসানের সঙ্গে। তিনি মানবজমিনের কাছে স্বীকার করেছেন আবাসিক ডাক্তার পরিচয়দানকারী তালহা নিজে একজন মাদকাসক্ত রোগী এবং সে ওই নিরাময় কেন্দ্রের রোগীদের দেখাশোনা এবং পর্যবেক্ষণ করেন। পলিন দাবি করেন তালহা চিকিৎসা দেয় না তবে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করে মূল ডাক্তারকে রিপোর্ট করেন। মৃত শুভকে মারধর করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মারধরের ঘটনা ঘটেনি। শরীরের আঘাতের চিহ্নের বিষয়ে তিনি বলেন সেটি কীভাবে হলো আমার জানা নেই।
শুভর চিকিৎসক বগুড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. আজিজুল হাকিম মানবজমিনকে বলেন, রোগীকে আমি অনেকদিন ধরেই চিকিৎসা দিয়ে আসছি। আমার প্রেসক্রিপশনের ওষুধের বাইরে যদি কোনো ওষুধ তাকে দিয়ে থাকে সেটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। আমার প্রেসক্রিপশনের ওষুধ অনেকদিন ধরেই শুভ পাচ্ছে। ওই ওষুধগুলোতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজেই হতো। পুরো বিষয়টি ময়নাতদন্তে জানা যাবে। নিহতের বোনজামাই ফরহাদ সোহাগ বলেন, চলতি মাসের ১৩ তারিখে মানসিক সমস্যার কারণে একজন চিকিৎসকের পরামর্শে শুভকে মায়ের আশ্রয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। তিনি দাবি করেন, সামিউল মাদকাসক্ত ছিলেন না। প্রায় এক মাস আগে তিনি ডাকাতির শিকার হন এবং সে সময় তাকে মারধর করা হয়। ওই ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ও ট্রমায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শেই তাকে কিছুদিন পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য কেন্দ্রে রাখা হয়। হঠাৎ রাত ৯টার দিকে নিরাময় কেন্দ্র থেকে ফোন করে জানানো হয়, তার শারীরিক অবস্থা খারাপ এবং তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। আমাদেরও সেখানে যেতে বলা হয়। পরে হাসপাতালে গিয়ে আমরা তাকে মৃত অবস্থায় পাই।
নিহতের চাচাতো ভাই তাপস জানান, কয়েকদিন আগে আমার সঙ্গে শুভর কথা হয়েছে। তখন তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক মনে হয়েছে। তার গুরুতর কোনো শারীরিক অসুস্থতার কথা আমাদের জানানো হয়নি। হাসপাতালে গিয়ে লাশের শরীরে একাধিক দাগ দেখতে পাই। তার ডান হাত ও ডান পাশের পাঁজরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আমাদের ধারণা, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তফা মঞ্জুর বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে যায়। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তিনি আরও জানান, মাদক নিরাময় কেন্দ্রের কর্মী হুমায়ুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তিনিই শুভকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। হাসপাতাল থেকেই তাকে হেফাজতে নেয়া হয়।
