অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বৃটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। তার নেতৃত্বে বৃটেনের নতুন সরকারকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীতে চলছে নানা ধরনের হিসাব-নিকাশ। বিবিসির যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউক্রেন, ইউরোপ, ফ্রান্স ও ভারতবিষয়ক প্রতিনিধিরা তুলে ধরেছেন, বার্নহ্যামের নেতৃত্বকে বিভিন্ন দেশ কীভাবে দেখছে। বিবিসির উত্তর আমেরিকা প্রতিনিধি অ্যান্থনি জারকার লিখেছেন, এ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। ট্রাম্পের ধারণা, বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী হলেও তার সবচেয়ে বড় দুটি উদ্বেগ- অভিবাসন নীতি এবং উত্তর সাগরে তেল ও গ্যাস উত্তোলন নিয়ে বৃটিশ সরকারের অবস্থানে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না। মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, যদি এড মিলিব্যান্ড অর্থমন্ত্রী হন, তাহলে বৃটেনের পরিবেশনীতি অপরিবর্তিত থাকবে। কারণ জ্বালানিমন্ত্রী হিসেবে তিনি উত্তর সাগরে নতুন তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লাইসেন্স বন্ধ করেছিলেন। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই বেশ উষ্ণ ছিল।
কিন্তু বার্নহ্যাম সম্পর্কে ট্রাম্পের ধারণা এখনও সীমিত। তিনি তাকে ‘একটি শহরের মেয়র’ হিসেবে জানেন এবং মনে করেন তিনি অত্যন্ত উদারপন্থী। তবে আড়ালে মার্কিন কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই বার্নহ্যামের টিমের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তারা চাইছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ইভেট কুপার দায়িত্বে বহাল থাকুন, যাতে বৃটেনের পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
স্টারমারের আমলে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো হলেও ট্রাম্প চান, ইউরোপের অন্য দেশগুলোর জন্য উদাহরণ তৈরি করতে বৃটেন আরও বেশি প্রতিরক্ষা ব্যয় করুক। এছাড়া ইরান যুদ্ধের সময় বৃটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়েও ওয়াশিংটন ও লন্ডনের মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপড়েন এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত হওয়ায় বার্নহ্যামের সামনে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি সুযোগও আছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে তিনি স্টারমারের মতো ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করতে পারেন। তবে প্রতিরক্ষা ব্যয়, ডিজিটাল কর, জ্বালানি উত্তোলন, আন্তর্জাতিক সংঘাত ও বাণিজ্য নিয়ে মতপার্থক্য দুই নেতার সম্পর্ককে কঠিনও করে তুলতে পারে।
লন্ডনের রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিরক্ত বেইজিং
বিবিসির চীন প্রতিনিধি লরা বিকার লিখেছেন, ২০১৮ সালে বার্নহ্যাম উত্তর ইংল্যান্ডের উন্নয়নে চীনের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল হবে। কারণ অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি- বিশেষ করে গুপ্তচরবৃত্তি, বৃটেনে বসবাসরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগ এখন বড় বিবেচ্য বিষয়। স্টারমার বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করেছিলেন এবং আট বছর পর প্রথম বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেইজিং সফর করেন। এখন প্রশ্ন হলো, বার্নহ্যামও কি একই পথ অনুসরণ করবেন, নাকি ভিন্ন অবস্থান নেবেন। বেইজিংয়ে ধারণা, ব্রেক্সিটের পর বৃটেনে ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতীক। চায়না ইনস্টিটিউটস অব কনটেম্পোরারি ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের ঝ্যাং জিয়ান একে বৃটেনের পরিচয় সংকট বলে মন্তব্য করেছেন।
সম্পর্কের কোনো পরিবর্তনের আশা নেই মস্কোর
বিবিসির কূটনৈতিক প্রতিনিধি জেমস ল্যান্ডেল লিখেছেন, মস্কোতে প্রায়ই বৃটেনকে ক্রেমলিনের এক নম্বর শত্রু বলা হয়। এর প্রধান কারণ ইউক্রেনকে বৃটেনের দীর্ঘদিনের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা। রাশিয়ার সরকারি পত্রিকা রসিস্কায়া গাজেতা বার্নহ্যামকে রাশিয়ার ধারাবাহিক সমালোচক হিসেবে উল্লেখ করেছে। বার্নহ্যাম সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, তিনি ২০১৪ সালে ক্রাইমিয়া দখলের বিরোধিতা করেছিলেন, ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ রাশিয়ায় আয়োজনের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনকে সমর্থন করে আসছেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, স্টারমার রাশিয়া-বৃটেন সম্পর্ক উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। তার মতে, বার্নহ্যামও স্টারমারের নীতি থেকে ভিন্ন কিছু করবেন- এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
ইউক্রেন বৃটেনের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ
ইউক্রেন প্রতিনিধি সারা রেইন্সফোর্ড লিখেছেন, ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেন এখন পঞ্চম বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে যাচ্ছে। কিয়েভের উদ্বেগ হলো, বৃটেনের রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন ইউক্রেনের প্রতি সামরিক, অর্থনৈতিক ও ড্রোন সহায়তায় প্রভাব না ফেলে। তবে বরিস জনসন থেকে শুরু করে স্টারমার পর্যন্ত সব প্রধানমন্ত্রীই ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়েছেন। বার্নহ্যামের অতীত মন্তব্যেও সেই অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নেই।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দিকে নজর
ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপ সম্পাদক কাটিয়া অ্যাডলার লিখেছেন, ইউরোপের দেশগুলো জানতে চাইছে বার্নহ্যামও কি স্টারমারের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী হবেন। তবে অভিবাসীদের অবাধ চলাচল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাস্টমস ইউনিয়ন বা একক বাজারে পুনরায় যোগদানের মতো বিষয়ে লেবার পার্টির বর্তমান অবস্থান বদলাবেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ ছাড়া ন্যাটোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি বৃটেন পূরণ করবে কি না, তা নিয়েও ইউরোপের দেশগুলোর আগ্রহ রয়েছে।
ফ্রান্স: স্টারমারের মতো অবস্থান আশা করছে প্যারিস
ফ্রান্স প্রতিনিধি হিউ স্কোফিল্ড লিখেছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বার্নহ্যামের অভিজ্ঞতা সীমিত হওয়ায় ফ্রান্সেও তাকে নিয়ে খুব বেশি ধারণা নেই। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো আশা প্রকাশ করেছেন, বার্নহ্যামের নেতৃত্বে বৃটেনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। প্যারিস চায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, ছোট নৌকায় অভিবাসন ঠেকানো এবং ইউক্রেন ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হোক।
দিল্লির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা
দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি আজাদেহ মোশিরি লিখেছেন, ভারতে বার্নহ্যাম এখনও তুলনামূলকভাবে অপরিচিত একটি নাম। দিল্লির কর্মকর্তারা মনে করছেন, বৃটেনের রাজনৈতিক নাটকীয়তা এখনও শেষ হয়নি। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার যশবর্ধন কুমার সিনহা বার্নহ্যামকে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে বর্ণনা করলেও বলেছেন, তার সামনে শক্তিশালী রিফর্ম দলের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিগত ধারাবাহিকতা। বিশেষ করে জুলাইয়ে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা বৃটেন-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি যাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যায়। এ ছাড়া ভারতীয় শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের জন্য বৃটেনের অভিবাসন নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকেও দিল্লি সতর্ক নজর রাখবে।
