মিয়ানমারের আটক সাবেক নেত্রী অং সান সু চি সুস্থ আছেন। তার যথাযথ দেখভাল করা হবে বলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানকে আশ্বস্ত করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার। তারা তাকে ‘আমাদের বোন’ বলে সম্বোধন করেছে। এ খবর দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, মিয়ানমারে আসিয়ানের বিশেষ দূত এবং ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া তেরেসা লাজারো জানান, মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে বলেছেন- অং সান সু চি আমাদের আত্মীয়, তিনি আমাদের বোন। তাই আমরা তার যত্ন নেব।
মিয়ানমারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সুচির সরকারকে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করে দেশটির সেনাবাহিনী। তার পর থেকে ৮১ বছর বয়সী অং সান সু চি আটক রয়েছেন তাদের হেফাজতে। এরপর থেকেই তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়ে আসছেন লাজারো। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে আমার উপলব্ধি হলো, অং সান সু চি সুস্থ আছেন। রোববার ১১ সদস্যের আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রথমবারের মতো সরাসরি মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিন মাউং সোয়ে-এর সঙ্গে বৈঠক করেন।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম এমন বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। এর লক্ষ্য ছিল আসিয়ানের শান্তি উদ্যোগকে আবারও সক্রিয় করা। তবে এ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ দেশটির গৃহযুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অং সান সু চি একাধিক ফৌজদারি মামলায় মোট ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সম্প্রতি তার সাজা এক-তৃতীয়াংশ কমানো হয়েছে। তার রাজনৈতিক মিত্রদের দাবি, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই সাজানো হয়েছে। সু চি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে বর্তমানে তাকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
সামরিক জান্তা আসিয়ানের সঙ্গে সম্মত হওয়া পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় মিয়ানমারের শীর্ষ নেতৃত্বকে দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবুও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন লাজারো। তিনি বলেন, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই কিছু অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। লাজারোর ভাষায়, সবকিছু এক ধাপে করা সম্ভব নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং আমি মনে করি, এ ধরনের সব ধরনের সংলাপই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব পাস করে। তাতে আসিয়ানের শান্তি উদ্যোগকে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে সেনাসমর্থিত নতুন বেসামরিক সরকারকে ওই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানানো হয়। তবে লাজারো বলেন, পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা এখনও সংলাপ শুরু এবং সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কার্যকর। তিনি বলেন, তারা এটি গ্রহণ করুক বা প্রত্যাখ্যান করুক, আমি আমার অবস্থানে অটল। আসিয়ানও পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনার পক্ষেই রয়েছে।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও জানান, বৈঠকে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিন মাউং সোয়ের কাছে তাদের প্রত্যাশা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া উচিত, যাতে তিনি সত্যিই সুস্থ আছেন কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৈঠকে আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং সংগঠনটির কার্যক্রমে মিয়ানমারের পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গঠনমূলক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এদিকে রোববার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারের ২০টি রাজনৈতিক দল ও জাতিগত সংখ্যালঘু সংগঠন আসিয়ানের এই বৈঠক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তাদের অভিযোগ, যে সরকার প্রকাশ্যেই আসিয়ানের শান্তি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করছে, সেই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করা হলেও সংঘাতের অন্য পক্ষগুলোর সঙ্গে আসিয়ান পর্যাপ্ত যোগাযোগ করছে না। বিবৃতিতে বলা হয়, যে পক্ষ প্রকাশ্যে আসিয়ানের নিজস্ব শান্তি কাঠামো প্রত্যাখ্যান করেছে, তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা কঠিন।
