ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থান নিয়ে রহস্য ক্রমেই গভীর হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার এক সপ্তাহ পর তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও তখন থেকে তিনি জনসমক্ষে একবারও উপস্থিত হননি।
এমনকি আলি খামেনির প্রধান জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া তিনি কোনো লিখিত বার্তাও দেননি, ফলে দেশ-বিদেশে তার ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা আরও বেড়েছে।
জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সমর্থনে দায়িত্ব পাওয়া মোজতবা খামেনি ওই হামলায় মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আহত হন। তিনি পর্দার আড়াল থেকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তবে শারীরিকভাবে এখনও এতটা সুস্থ হননি যে জনসমক্ষে আসতে পারেন।
এদিকে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আবারও সংঘাত শুরু হওয়ায় তার স্বাস্থ্য ও নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ইসফাহানের ৪৭ বছর বয়সী এক দোকান মালিক তাঘি বলেন, নিরাপত্তার কারণে তিনি প্রকাশ্যে আসতে না-ও পারেন, সেটা বুঝি। কিন্তু দেশ এখন অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে। মানুষকে অন্তত দেখতে হবে যে একজন নেতা আছেন এবং তিনিই দেশ পরিচালনা করছেন।
পরিবারের সদস্যরাই প্রতিনিধিত্ব করছে
গত বৃহস্পতিবার আলি খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে তার কফিনের সামনে নামাজে নেতৃত্ব দেন তার অপর তিন ছেলে। ইরানের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় স্থানে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন দেশটির শাসনব্যবস্থায় পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্বকেই আবারও সামনে নিয়ে আসে।
মোজতবা খামেনির তিন ভাইই জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় আলেম হলেও তারা ইরানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত নন এবং ভবিষ্যতেও তাদের বড় রাজনৈতিক ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হয়।
অনেকেই আশা করেছিলেন, বাবার দাফনের সময় অন্তত একটি ভিডিও বার্তা, অডিও বক্তব্য বা নতুন কোনো ছবি প্রকাশ করবেন মোজতবা খামেনি। কিন্তু তেমন কিছুই দেখা যায়নি।
নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগত কারণ
ইরানের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলোর ভাষ্য, গত ৮ মার্চ ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করার পর থেকে তার কোনো নতুন ছবি বা বক্তব্য প্রকাশ না হওয়ার পেছনে মূল কারণ স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা।
এর কারণ, কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক হামলায় তার বাবা নিহত হন। ফলে নতুন সর্বোচ্চ নেতার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অত্যন্ত বেশি।
একই সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় ও বিপ্লবী নেতৃত্বের সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সক্ষম দেখানো প্রয়োজন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি এখনও সেই অবস্থায় পৌঁছাননি।
তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সর্বশেষ সরকারি মন্তব্য আসে গত মে মাসে। তখন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানান, তিনি মোজতবা খামেনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
যদিও বর্তমানে দেশ পরিচালনায় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, তবু বিশ্লেষকদের প্রশ্ন- একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা কতদিন জনসমক্ষে না এসে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন?
স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারি বলেন, যখন উত্তরসূরি নিজেই সামনে নেই, তখন তার জন্য জনসমর্থন ও ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ভাবমূর্তি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই হবে না।
ইরানিদের উদ্বেগ বাড়ছে
রয়টার্সের সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কথা বলা ২০ জনেরও বেশি ইরানি নাগরিক মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তেহরানের ৫১ বছর বয়সী শিক্ষক মোহাম্মদরেজা বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি দেশে অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়াবে, বিশেষ করে সাবেক নেতার দাফনের পর।
ধর্মীয় মর্যাদায় ঘাটতি, ভরসা আইআরজিসি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদটি বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে আলাদা। দেশটির রাষ্ট্রীয় আদর্শ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা শিয়া ইসলামের দ্বাদশ ইমামের পৃথিবীতে প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।
ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন ইসলামি বিপ্লবের অবিসংবাদিত নেতা ও শীর্ষ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তার উত্তরসূরি আলি খামেনি শুরুতে সেই ধর্মীয় মর্যাদা না পেলেও ৩৭ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
মোজতবা খামেনির ক্ষেত্রেও ধর্মীয় যোগ্যতা সীমিত। তিনি তার বাবার মতো রাষ্ট্রপতি ছিলেন না বা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন না। বরং দীর্ঘদিন তিনি আলি খামেনির বিশাল প্রশাসনিক কার্যালয় পরিচালনা করেছেন এবং দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছেন।
তবে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্বের ধরন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এখনও অনেকটাই অজানা। বিশ্লেষকদের ধারণা, তার শাসনামলেও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়নি, ইরানের অর্থনীতি এখনও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে এবং নতুন করে গণবিক্ষোভের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও রহস্য আরও গভীর হচ্ছে।
