মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিউইয়র্ক টাইমসের কয়েকজন সাংবাদিককে সমন জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। পত্রিকাটি জানিয়েছে, শুক্রবার মার্কিন আইন মন্ত্রণালয় তাদের কয়েকজন সাংবাদিককে সমন পাঠিয়ে পাঁচ দিন পর ম্যানহাটানে একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরির সামনে সাক্ষ্য দিতে নির্দেশ দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে এটিই সর্বশেষ। নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেডারেল এজেন্টরা কয়েকজন সাংবাদিকের বাসায় গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমন পৌঁছে দেন। বার্তা সংস্থা এপি’কে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।
সমনের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধ জানালে জবাবে মার্কিন আইন মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে, তারা ‘জাতীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা’ তদন্ত করছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্পষ্ট করে বলছি, সাংবাদিকরা আমাদের তদন্তের লক্ষ্য নন। লক্ষ্য হলেন তারা, যারা গোপন শ্রেণিবদ্ধ তথ্য ফাঁস করেছেন। আইন মন্ত্রণালয় আরও জানায়, আমরা আইন উপেক্ষা করব না।
অন্যদিকে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এ সমনের নিন্দা জানিয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ন্যাশনাল প্রেস ক্লাব এক বিবৃতিতে বলেছে, নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের সমন জারির সিদ্ধান্ত প্রতিটি মার্কিন নাগরিককে উদ্বিগ্ন করে। কারণ এটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সাংবিধানিক অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সংগঠনটি বিচার বিভাগের প্রতি অবিলম্বে সমন প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের যে নীতি- স্বাধীন সংবাদমাধ্যম জনগণের সেবা করে, সরকারের নয়, তা পুনর্ব্যক্ত করা উচিত। ফ্রিডম অব দ্য প্রেস ফাউন্ডেশনের অ্যাডভোকেসি পরিচালক সেথ স্টার্ন পৃথক এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার যখন বলে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সাংবাদিকদের তদন্ত প্রয়োজন, তখন প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের সুনাম রক্ষা করতে চায়। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে উঠে আসা নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রশাসন বিব্রত হতে পারে। কিন্তু সেটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করতে পারে না। নিউইয়র্ক টাইমসের আইনজীবী ডেভিড ম্যাকক্রো বলেন, সংবাদকর্মীদের বাড়ির দরজায় ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী যেকোনো আমেরিকানের বিবেককে নাড়া দেয়ার মতো ঘটনা।
ট্রাম্প-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ফক্স নিউজের প্রধান জাতীয় নিরাপত্তা সংবাদদাতা জেনিফার গ্রিফিনও এক্সে দেয়া এক পোস্টে ম্যাকক্রো ও ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হন। তিনি লিখেছেন, এয়ার ফোর্স ওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে বৈধ সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের সমন জারি করার এই সরকারি পদক্ষেপ প্রতিটি মার্কিন নাগরিককে উদ্বিগ্ন করে।
কাতারের দেয়া ৪০ কোটি ডলারের বিমান
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা বিমানটি কাতারের দেয়া ৪০ কোটি ডলারের উপহার। এটি ১লা জুলাই প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে নর্থ ডাকোটায় যায়। পরে ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্পকে তুরস্কেও বহন করে। তবে তুরস্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় ট্রাম্প যাত্রাপথের একটি অংশ পুরোনো মডেলের এয়ার ফোর্স ওয়ানে ভ্রমণ করেন। সে সময় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল। ইরানের সঙ্গে তুরস্কের সীমান্ত রয়েছে এবং ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।
নতুন বিমানটিতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই- এমন জল্পনার মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে জানায়, নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা (অ্যান্টি-মিসাইল সক্ষমতা) এবং পুরোনো বিমানগুলোর মতো আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেই। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সিক্রেট সার্ভিসের অনুরোধেই ট্রাম্প তুরস্ক থেকে ফেরার পথে যাত্রার একটি অংশ পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে সম্পন্ন করেন।
ট্রাম্পের অস্বীকার
ট্রাম্প অবশ্য নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগের কথা অস্বীকার করেছেন। সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে পুরো পথ না ফেরার সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত কোনো কারণ জড়িত ছিল না। ইরান এয়ার ফোর্স ওয়ানকে কোনো বিশ্বাসযোগ্য হুমকি দিয়েছিল কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি সব সময়ই হুমকির মধ্যে থাকি। আমি তাদের তালিকার এক নম্বরে আছি।
হোয়াইট হাউসও নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ঘাটতি থাকার কথা অস্বীকার করে। তারা বিমানটিকে ‘অত্যাধুনিক’ বলে উল্লেখ করে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র স্টিভেন চিয়াং এক বিবৃতিতে বলেন, নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে এমন উচ্চমানের নিরাপত্তা প্রোটোকল সংযুক্ত করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট ও তার সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
তিনি আরও দাবি করেন, তুরস্ক থেকে ফেরার সময় ট্রাম্প পুরো পথ নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে ভ্রমণ না করার সিদ্ধান্ত ছিল সম্ভাব্য হুমকি এড়াতে একটি বিভ্রান্তিমূলক কৌশল।
এফবিআইয়ের অনুরোধ ও সমন
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এফবিআইয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পত্রিকাটির সঙ্গে যোগাযোগ করে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছিলেন। তবে তিনি এর বিস্তারিত কারণ জানাননি। পরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক জুলিয়ান ই. বার্নস, এরিক লিপটন, টেইলর পেজার এবং এরিক শ্মিট গ্র্যান্ড জুরির সামনে সাক্ষ্য দেয়ার সমন পান। হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউএইচসিএ) এবং নিউইয়র্কের সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বকারী শ্রমিক সংগঠন নিউজগিল্ড অব নিউইয়র্ক ওই সাংবাদিকদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ডব্লিউএইচসি-এর সভাপতি ওয়েইজিয়া জিয়াং বলেন, সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানো কিংবা তাদের তথ্যসূত্র প্রকাশে চাপ দেয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার নিন্দা জানায় আমাদের সংগঠন।
আগেও সাংবাদিকদের সমন
গত জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের তদন্তে বিচার বিভাগ ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকদেরও সমন জারি করেছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো আদালতে গোপন নথি জমা দিয়ে আপত্তি জানানোর পর বিচার বিভাগ সেই সমন প্রত্যাহার করে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্র্যান্ড জুরি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে প্রসিকিউটররা ফৌজদারি অভিযোগ গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ট্রাম্পের দুই মেয়াদকালেই তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর সাম্প্রতিক একটি আলোচিত উদাহরণ হলো, মিনেসোটার একটি গির্জায় অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই)-এর এক কর্মকর্তাকে ঘিরে জানুয়ারির একটি বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করায় সাংবাদিক ডন লেমন, জর্জিয়া ফোর্ট এবং আলোকচিত্রী জুন বোলম্যানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনার চেষ্টা।
এ ছাড়া গত জানুয়ারিতে মেরিল্যান্ডের একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি এক মার্কিন সামরিক ঠিকাদারকে গোপন নথি ফাঁসের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। ওই তদন্তের অংশ হিসেবে এফবিআই ওয়াশিংটন পোস্টের এক সাংবাদিকের বাড়িতেও তল্লাশি চালায়।
