ঘড়ির কাঁটায় তখন ৮৫ মিনিট ৩২ সেকেন্ড। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামের ডাগআউট থেকে সাইডলাইনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো। স্কোর ১-১ সমতা। বেলজিয়ামের রক্ষণভাগ ভাঙতে একের পর এক আক্রমণ করেও ব্যর্থ স্প্যানিশরা। লুইস দে লা ফুয়েন্তে যখন মেরিনোর পিঠ চাপড়ে মাঠে পাঠাচ্ছেন, তখন হয়তো গ্যালারিতে বসা দুই মাসের একরত্তি শিশু ‘মার্সো’ জানতো না পরের ১১৫ সেকেন্ডে তার বাবা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় কী অবিশ্বাস্য এক গল্প লিখতে যাচ্ছেন। ঠিক ৮৭ মিনিট ২৬ সেকেন্ড। ঘাসের ওপর বুটের আঁচড় কেটে ডি-বক্সের অনেকটা দূর থেকেই এক বুলেট গতির শট নিলেন তরুণ পাউ কুবারসি। বেলজিয়ামের ইনজুরিতে পড়া থিবো কোর্তোয়ার বদলে নামা তরুণ গোলকিপার সেনে লামেন্স বলটা তালুবন্দী করতে গিয়েও ফাম্বল করলেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের তপ্ত দুপুরে যখন বাকি সবাই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল, তখন স্টেডিয়ামের সবচেয়ে সজাগ মানুষটার নাম মিকেল মেরিনো। চিলের মতো দৃঢ়তায় রিবাউন্ড বলটায় ছোঁ মেরে জাল কাঁপিয়ে দিলেন তিনি। মাত্র একটা টাচ, ১ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডের জাদু! একে ব্ল্যাক ম্যাজিক না বলে উপায় আছে? এই এক গোলে মেরিনো ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এমন এক জায়গায় নিজের নাম খোদাই করেছেন, যেখানে অনেক মহাতারকারাও পৌঁছাতে পারেননি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেরিনোই প্রথম ‘সুপার-সাব’, যিনি ব্যাক-টু-ব্যাক দুটি নকআউট ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল করলেন। শুধু তাই নয়, গত ৬০ বছরের (১৯৬৬ বিশ্বকাপ থেকে) ইতিহাসে নকআউটে ৮৭ মিনিটের পরে দুটি ম্যাচ উইনার গোল করা একমাত্র ফুটবলারও তিনি। মেরিনোর এই রূপকথা শুধু তার একার নয়, এটা এক বাবার অধরা স্বপ্ন পূরণের গল্পও বটে। মেরিনোর বাবা আনহেল মেরিনো তার ১৭ বছরের দীর্ঘ ফুটবল ক্যারিয়ারে কখনো স্পেনের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়াতে পারেননি। শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্যালারিতে বসে বাবা দেখছেন, আর ছেলে গোল করে সেই কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে চিল চিৎকার দিয়ে ছুটে গিয়ে দুই হাত মেলে ডাইভ দিচ্ছেনÑ ঠিক যেভাবে বহু বছর আগে বাবা আনহেল নিজের গোল উদযাপন করতেন। বাবার অধরা স্বপ্নটাই যেন আজ ছেলের বুটে বিশ্বমঞ্চে অমর হয়ে রইল।
স্পেনকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তোলার এই নায়ককে নিয়ে স্প্যানিশ দৈনিক ‘মার্কা’ এক চিরন্তন সত্য লিখেছে- ‘মেরিনো থেকে মেরিনো, স্পেন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। ২০১০ সালের ডেভিড ভিয়ার মতো। তফাত শুধু একটাই, গোল করতে মিকেলের অনেক কম সময় লাগে।’ মার্কার এই রসিকতা মোটেও অমূলক নয়। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ১৬র ম্যাচে লেগেছিল ৫ মিনিট, গোল করেছিলেন ৯১ মিনিটে। আর বেলজিয়ামের বিপক্ষে দরকার হলো তারও কম। শেষ দুই ম্যাচে মাত্র ৮ মিনিট মাঠে থেকে আস্ত একটা দেশের জাতীয় নায়ক বনে যাওয়া- এ তো ফুটবল নয়, যেন সুপার ম্যাজিক! অথচ এই অবিশ্বাস্য রূপকথার নেপথ্যে রয়েছে এক বুক ভাঙা যন্ত্রণা। গত জানুয়ারিতে মেরিনোর পায়ের পাতায় এক অদ্ভুত ইনজুরি ধরা পড়ে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে ‘স্ট্রেস ফ্র্যাকচার’। এমন এক জায়গায় হাড় ফেটেছিল, যা বড় বড় বিশেষজ্ঞরা এর আগে কখনো দেখেননি। আর্সেনালের হয়ে মাসের পর মাস মাঠের বাইরে, বিশ্বকাপের আশা তখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র এক মাস আগে যখন মাঠে ফিরলেন, মেরিনো নিজেও ভাবেননি স্কোয়াডে জায়গা হবে। ম্যাচ শেষে আবেগঘন কণ্ঠে বলছিলেন, ‘কয়েক মাস আগেও এখানে থাকাটা কল্পনাতীত ছিল। আজ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুখের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পেছনের সেই অন্ধকার দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে, যারা আমাকে টেনে তুলেছে তাদের কথা মনে পড়ছে।’ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের তিনি এক ‘সুইস আর্মি নাইফ’। বেঞ্চে বসে থাকলেও তার মুখে কোনো কালো মেঘ জমে না। কোচ ম্যাচ শেষে অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘মিকেল এক কমপ্লিট ফুটবলার। ও ৬, ৮, ১০ এমনকি ৯ নম্বরেও সেরাটা দিতে পারে। ম্যাচের একপর্যায়ে আমরা ওকে পিওর সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলানোর কথাই ভাবছিলাম।’
তবে সব ট্যাকটিক্স, সব পরিসংখ্যানের ঊর্ধ্বে এই ম্যাচের আসল আবেগ লুকিয়ে ছিল মেরিনোর দুই মাসের ছেলে মার্সোর মাঝে। বাচ্চাটা বাবার পেশাদারী ব্যস্ততায় জন্মের পর থেকে নিজের জন্মদাতাকে খুব একটা কাছে পায়নি। পর্তুগাল ম্যাচে মার্সো গ্যালারিতে ছিল না, তাই হয়তো কোয়ার্টার ফাইনালে তাকে মাঠে নিয়ে আসা হয়েছিল। ম্যাচ শেষে মেরিনোর হাসিমুখে দেয়া সরল স্বীকারোক্তি ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে দাগ কেটে থাকবে দীর্ঘদিন- ‘যেহেতু ও আগের ম্যাচে থাকতে পারেনি, তাই আমাকে এই ম্যাচেও গোলটা করতে হতো, যাতে ও এই জাদুকরি অভিজ্ঞতার অংশ হতে পারে!’ লা রোজাদের পাসিং ফুটবলে যখন লামিন ইয়ামালরা ফিনিশিং লাইনে খেই হারিয়ে ফেলছেন, তখন বেঞ্চ থেকে উঠে এসে বারবার ত্রাতা হচ্ছেন এই গানার মিডফিল্ডার। আগামী মঙ্গলবার নিউ জার্সির ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সামনে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স। স্প্যানিশ মিডিয়া তো ইতিমধ্যেই মজা করে ভবিষ্যৎবাণী করে ফেলেছে- ‘ফ্রান্সের বিপক্ষেও মেরিনো ৮৯ মিনিটে মাঠে নামবে এবং স্পেনকে ফাইনালে তুলবে।’
