উত্তরসূরির ভুল বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের বিদায়

উত্তরসূরির ভুল বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের বিদায়

ফন্ট সাইজ:

স্পেনের বিপক্ষে ২-১ গোলের হারটি বেলজিয়ামের জন্য কেবলই একটি ম্যাচ হার ছিল না। এটি ছিল বিশ্বফুটবলে দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সেরা প্রতিভাধর প্রজন্মের এক বিষাদময় বিদায়। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে রুডি গার্সিয়ার শিষ্যরা বুক চিতিয়ে লড়াই করলেও, শেষ মুহূর্তের ট্র্যাজেডিতে অবসান ঘটলো তাদের বহুল আলোচিত সোনালি প্রজন্মের। থিবো কোর্তোয়া, রোমেলু লুকাকু, কেভিন ডি ব্রুইনা এবং আক্সেল উইটসেলদের মতো তারকাদের বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটি বিষাদের রঙে রূপ নিলো তাদেরই এক উত্তরসূরির মারাত্মক ভুলে।

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয় দিয়ে রূপকথার পথচলা শুরু হয় এই বেলজিয়ামের। সেখানে একই সঙ্গে মাঠে ছিলেন কোর্তোয়া, ডি ব্রুইনে, উইটসেল আর লুকাকু। তার করুণ সমাপ্তি ঘটল ১২ বছর পর, এবারের উত্তর আমেরিকান মঞ্চে। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই দুই সারথি উইটসেল ও লুকাকুর একে অপরকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটি ছিল এক যুগের এক গৌরবময় অধ্যায়ের বিদায়ী কোলাজ।

ম্যাচের শুরু থেকেই গার্সিয়ার দলকে চোটের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। ম্যাচের ঠিক আগ মুহূর্তে মূল একাদশ থেকে বাদ পড়েন অধিনায়ক ইউরি তিলেমানস। এর আগে শেষ ১৬র ম্যাচে এসিএল ইনজুরির শিকার হন আমাদু ওনানা। মাঠে স্পেনের ফাবিয়ান রুইজের গোলে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি বেলজিয়াম। প্রথমার্ধের ৪১ মিনিটে টিমোথি কাস্তাগনের ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক ডাইভিং হেডে সমতা ফেরান চার্লস ডি কেটেলার। বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় গোল পাওয়া এই ২৫ বছর বয়সী উইঙ্গার গোল উদযাপনে বেলজিয়ামের নকআউট ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা লুকাকুর রেকর্ডে ভাগ বসান। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের চিত্রনাট্য ছিল বেলজিয়ামের জন্য নির্মম। ম্যাচের ৬০ মিনিটে গার্সিয়ার ট্রিপল পরিবর্তনের মাধ্যমে যখন লুকাকু এবং উইটসেল মাঠে নামেন, তখন ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই চার অভিজ্ঞ মুখ একসঙ্গে মাঠ মাতাতে শুরু করেন। তবে স্পেনের গতিশীল ফুটবলের সামনে ধীরে ধীরে ক্লান্ত দেখায় এই ওল্ড গার্ডদের। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ৭১ মিনিটে। দুর্দান্ত কিছু সেভ করার পর হিপ ইনজুরিতে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা গোলকিপার কোর্তোয়া। গ্যালারির দুই দেশের দর্শকরা দাঁড়িয়ে এই মহানায়ককে করতালি দিয়ে বিদায় জানান। তার জায়গায় পোস্টের নিচে দাঁড়ান ২৪ বছর বয়সী সেনে লামেন্স। ৮০ মিনিটে ইনজুরি ও ক্লান্তির কাছে হেরে মাঠ ছাড়তে হয় অধিনায়ক ব্রুইনাকেও।

কোর্তোয়ার উত্তরসূরির হাত ধরে শেষ রক্ষা হয়নি, বরং তারা ডূবে গেছে অতল গহ্বরে। ৮৮ মিনিটে স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসির এক দূরপাল্লার শট গ্লাভসবন্দী করতে ব্যর্থ হন লামেন্স। রিবাউন্ড বলটি জালে ঠেলে দেন স্পেনের মিকেল মেরিনো। এই এক ভুলেই শেষ হয়ে যায় প্রবীণদের শেষবারের মতো বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। সমালোচকদের মতে, এত প্রতিভাধর এক দল কোনো বড় ট্রফি জিততে না পারায় একে সোনালী প্রজন্ম বলা চলে না। স্প্যানিশ সাংবাদিক গিলেম বালাগ যেমন বলেন, ‘গোল্ডেন জেনারেশন হতে হলে কিছু গোল্ড জিততে হয়। ১২ মিলিয়নের একটি দেশের কাছে ইংল্যান্ড বা ইতালির মতো ট্রফি দাবি করা হয়তো একটু বেশিই ছিল। তবে ২০১৮ বিশ্বকাপে তাদের তৃতীয় হওয়াটা মানুষ ভুলে গেছে।’ ম্যাচ শেষে বেলজিয়ান কোচ রুডি গার্সিয়ার কণ্ঠে ছিল বিদায়ী আবেগের সুর।

তিনি বলেন, ‘যারা হয়তো জাতীয় দল থেকে বিদায় নিচ্ছে, তাদের জন্য আমি হতাশ। আমি চেয়েছিলাম আমার অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে শেষবার একটা হুংকার দিতে। এটা সত্যিই দুঃখজনক, কারণ তারা এই বিশ্বকাপে আরও দূরে যাওয়া পাওয়ার যোগ্য ছিল।’ তবে তরুণদের নিয়ে আশাবাদী কোচ আরও বলেন, ‘আমাদের তরুণ খেলোয়াড়রা এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নেবে। আমরা স্পেনের মতো দলকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছি। আমরা গোলকিপার এবং অধিনায়ককে হারিয়েছি, যা পরিকল্পনায় ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত আমরা সুযোগগুলো রুপালি থালায় উপহার দিয়েছি।’ কোর্তোয়া হয়তো আগামী বিশ্বকাপে কেবল অভিজ্ঞতার ডালি নিয়ে ফিরতেও পারেন। তবে ডি ব্রুইনা, উইটসেল বা লুকাকুদের আর কখনোই হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাবে না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন