মেসি যতদিন খেলবে সেরাই থাকবে

মেসি যতদিন খেলবে সেরাই থাকবে

ফন্ট সাইজ:

মেসি যতদিন খেলবে, বিশ্বের সেরা ফুটবলারই থাকবে- কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন এমন কথা। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে নামার আগে সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনার কোচ বলেন, ‘মেসির ফর্ম আমাকে বিন্দুমাত্র অবাক করে না। যারা ওকে চেনে না, তারা হয়তো ভেবেছিল ৩৯ বছর বয়সে এই পর্যায়ে খেলতে পারবে না। এর আগে আমি বহুবার বলেছি- ও যতদিন চাইবে, ততদিন সেরাই থাকবে। কোচ বলেই এ কথা বলছি না। মনেপ্রাণে এটা বিশ্বাস করি।’

খেলোয়াড়দের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারফরম্যান্সে ভাটা পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে যেন উল্টো। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে পৌঁছালেও দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদল এনেছেন নিজের খেলার ঢংয়ে। এখন তার খেলা বুদ্ধিদীপ্ত এবং ক্ষুরধার। ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৮ গোল করেছেন মেসি। যা একক বিশ্বকাপে তার সর্বোচ্চ। আগের রেকর্ডটি ছিল ২০২২ বিশ্বকাপে, ৭ গোল। এবারের কোয়ার্টার ফাইনালের আগপর্যন্ত দুই বিশ্বকাপ মিলে টানা ৯ ম্যাচে গোল পেয়েছেন মেসি।

আর্জেন্টাইন অধিনায়কের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে মুগ্ধ কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, সেরাটা দেয়ার সময় মেসি যন্ত্রের মতো কাজ করে। স্কালোনি বলেন, ‘লিও সব ম্যাচেই কমবেশি একই রকম দৌড়াচ্ছে। ফিটনেস কোচের সঙ্গে সে কঠোর পরিশ্রম করেছে। তার ফলও পাচ্ছে। একটা বিষয় পরিষ্কার, সে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছে। আর যখন নিজের সেরাটা দেয় এবং বুঝতে পারে সুযোগ তৈরি করতে পারছে, তখন সে একটা যন্ত্রের মতো কাজ করে।’
ফুটবল প্রতিদিনই আরও একটু বেশি শারীরিক, আরও বেশি গতিশীল হয়ে উঠছে। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের খেলার ঢংয়ে পরিবর্তন এনেছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। দেখা যায়, ম্যাচের বেশির ভাগ সময় মেসি হয় দাঁড়িয়ে আছেন, নয়তো অলস ভঙ্গিতে হাঁটছেন। তিনি পুরো ম্যাচ খেলেন না, তিনি খেলেন কয়েকটা মুহূর্ত।

আর সেই মুহূর্তগুলোতেই ম্যাচ বদলে দেন। ফিফার পরিসংখ্যান বলছে, এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শুরুর পাঁচ ম্যাচে মেসি মোট দৌড়েছেন ৩৫ হাজার ৮৬৮ মিটার। তার মধ্যে ৬৪ শতাংশ, অর্থাৎ ২২ হাজার ৯৫৮ মিটার, তিনি কাটিয়েছেন ‘জোন ওয়ান’-এ, যেখানে গতি ঘণ্টায় ০ থেকে ৭ কিলোমিটার। অর্থাৎ হাঁটা, কিংবা ধীরগতির চলা। কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার শেষ বত্রিশের ম্যাচে বৃটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ একটা পরীক্ষা চালিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের একটি নির্দিষ্ট ১৫ মিনিটের স্পেলে তারা স্টপওয়াচ ধরেছিল, মেসি ঠিক কতক্ষণ দৌড়েছেন তা মাপার জন্য। দেখা যায়, ওই ১৫ মিনিটে মেসি মাত্র ৫১ সেকেন্ড দৌড়েছিলেন! পুরো ৯০ মিনিটের হিসাবে যা দাঁড়ায় মাত্র ৫ মিনিটের কাছাকাছি। এই পরীক্ষাটা হয়তো পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক নয়। কিন্তু মেসি যে নিজেকে বদলে নিয়েছেন সেটার প্রমাণ হতে পারে এটাও। এবারের বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি গ্রুপ পর্বে প্রতি ৯০ মিনিটে সবচেয়ে কম দূরত্ব দৌড়েছেন (৮.১ কিমি), যা টুর্নামেন্টের ৬১৮ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের (গোলরক্ষক ছাড়া মাঠের অন্য খেলোয়াড়) মধ্যে সবার নিচে (৬১৮তম)। তবে অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে কম দৌড়েও তিনি গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি গোল (৬) করেন। এর মানে হলো, মেসি তার শক্তির সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার করেছেন।

পুরো মাঠে অহেতুক দৌড়াদৌড়ি না করে, যখনই তার দলের কাছে বল থাকতো না, তিনি হেঁটে হেঁটে সময় পার করতেন। এই হাঁটার ফলেই তিনি নিজের শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে পেরেছেন। একই সঙ্গে এটি তাকে চারপাশটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে আক্রমণের জন্য সবচেয়ে সেরা জায়গাটি খুঁজে নিতে সাহায্য করেছে। বিষয়টি অনেকটা একজন চতুর দাবাড়ুর মতো। বোর্ডের সব জায়গায় এলোমেলোভাবে ঘুঁটি না চেলে যেন ম্যাচ জেতানো চালটি দেয়ার জন্য একেবারে নিখুঁত মুহূর্তের অপেক্ষা! এই কৌশল সফল হতে গেলে মূলত দরকার দুটি জিনিস। প্রথমত, খেলা পাঠ করার অসাধারণ ক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, সতীর্থদের নিঃস্বার্থ পরিশ্রম। আর্জেন্টিনার বাকি ৯ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড় জানেন, তাদের বাড়তি দৌড়াতে হবে। তারা দৌড়াবেন, যাতে মেসি বিশ্রাম নিতে পারেন।

কোয়ার্টার ফাইনালের আগে পাঁচ ম্যাচ শেষে মেসি হাই স্পিড রান বা তীব্র গতির দৌড় দিয়েছেন ২৯৮টি। যেখানে হ্যারি কেইন ৬০০, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ৫১৪, উসমান দেম্বেলে ৪৭৭ এবং মিকেল ওইয়ারসাবালের দৌড় ৪৬১টি। কিলিয়ান এমবাপ্পে দিয়েছেন ৩৩৬টি হাই স্পিড রান। শুধু আর্লিং হলান্ড ৩১৪টি রান নিয়ে মেসির কাছাকাছি, কারণ নরওয়ের তৃতীয় ম্যাচে তিনি এক মিনিটও খেলেননি। তবে মোক্ষম সময়ে মেসির ভেতরের ঘুমন্ত সিংহটা জেগে ওঠে। মিশরের বিপক্ষে সেই নাটকীয় ও বিতর্কিত শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা যখন ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে, ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটে মেসিকে মনে হচ্ছিল এক খাঁচামুক্ত সিংহ। ৭৬ মিনিটের পর থেকে ম্যাচের সবচেয়ে বেশি টাচ, শট, ড্রিবল আর সুযোগ তৈরি করেন মেসি। গোল করেন এবং গোল করান।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন