যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, টানা ছয় দিনের অতি ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। ঘরবাড়ি. দোকানপাট, সড়ক-মহাসড়ক পানির নিচে। থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া, শৌচকার্যসহ দৈনন্দিক কার্যক্রম সারতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এসব এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।
প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে শত শত গ্রাম, সড়ক, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি তলিয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। দুর্গত এলাকায় তীব্র খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। শুক্রবার পাহাড়ধসে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আর জীবিকা হারিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন নিু আয়ের মানুষ।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে রেকর্ড পরিমাণ ৩২২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত এ বৃষ্টিপাত পরিমাপ করা হয়। এ সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে প্রায় এক হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়া আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্ব, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী-বর্তমানে কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী-এ পাঁচ নদ-নদীর পানি ৯টি স্টেশনে বিপৎসীমার উপরে রয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলিতে, মনু নদের পানি মনু রেলসেতু ও মৌলভীবাজারে, খোয়াই নদের পানিহবিগঞ্জের বল্লায়, সাঙ্গু নদের পানি বান্দরবান ও দোহাজারীতে এবং মাতামুহুরী নদীর পানি লামা ও চিরিঙ্গা স্টেশনে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জে কুশিয়ারাসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং সুরমার তীরবর্তী এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বাড়ির উঠোনে হাঁটু পানিতে খেলতে নেমে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে গিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে সাতকানিয়ার বাজালিয়ায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে কবরস্থান থেকে কয়েকটি লাশ ভেসে গেছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় নৌকা ডুবে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। আরেক বোন সাওরিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদিকে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে। এছাড়া আগামী ৭২ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সোমেশ্বরী, যাদুকাটা এবং ভোগাই-কংস নদ-নদীর পানিও বাড়তে পারে। এসব নদ-নদীর কোনো কোনো স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরীতে বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। জেলায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলায় প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।
শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে বাড়ির উঠানে হাঁটুপানিতে খেলার সময় শিশু মিরাজ ও আশিক ঢলের পানিতে ভেসে যায়। কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে উদ্ধার করে তাদের হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ১১ বছর বয়সি আশিক বাহারচড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে। অপর শিশু মিরাজ (১০) একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা। একই উপজেলার সরল ইউনিয়নের পশ্চিম জালিয়াঘাটা এলাকায় ঢলের পানিতে পড়ে তাহিনা নুর (১২) নামে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢলের পানিতে পড়ে ভেসে যায় শিশু তাহিনা। তাহিনা ওই এলাকার আবদুল করিমের মেয়ে।
সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আদালত ভবন, সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়, পৌরসভা ও থানা ভবন থানা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের একটি কবরস্থানের কবর থেকে পানির ঢলে ভেসে গেছে বেশ কয়েকটি লাশ। পরে এগুলো উঁচু স্থানে কবর দেওয়া হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলার দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ডুবে কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে উপজেলার বিভিন্ন অংশে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। চন্দনাইশ এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। মহাসড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার কসাইপাড়া ও পাঠানিপুল ব্রিজ এলাকায় দেখা গেছে রীতিমতো মহাসড়কের ওপরই জাল ফেলে মাছ ধরার উৎসবে মেতেছেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, শুক্রবার বৃষ্টি না হওয়ায় নগরীর বেশির ভাগ এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। তবে চান্দগাঁওসহ কিছু নিচু এলাকায় পানি রয়ে গেছে। দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার ও সিটি করপোরেশন।
চকরিয়া (কক্সবাজার) : কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় বন্যার পানিতে নৌকা ডুবে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) ও জেরিন (৭) নামে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। আরেক বোন সাওরিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বাড়িতে পানি ওঠায় শুক্রবার সকালে নৌকাযোগে পাশের উঁচু এলাকায় যাওয়ার সময় প্রবল স্রোতে শিশুদের বহনকারী নৌকা ডুবে যায়। এতে ঝর্ণাসহ তার দুই বোন সাওরিন মনি ও জেরিন পানিতে তলিয়ে যায়। বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান জানান, নৌকাডুবির পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঝর্ণার লাশ উদ্ধার করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেরিন মারা গেছে বলে তার বাবা আবদুল মালেক জানান।
কক্সবাজার : টানা ছয় দিনের অতি ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে কার্যত পানিতে তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদ। প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ভেঙে গেছে বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ। এতে তলিয়ে গেছে শত শত গ্রাম, সড়ক, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়েছেন। গত কয়েক দিনের দুর্যোগে ১৩ রোহিঙ্গাসহ ২৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছে এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
আগে বর্ষার পানি স্বাভাবিকভাবে বিল-ঝিল পেরিয়ে নদীতে যেত। কিন্তু রেললাইন নির্মাণের পর সেই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির চাইল্যাতলীর বাসিন্দা ফারুক আহমদ বলেন, রেলপথ নির্মাণের সময় প্রয়োজনের তুলনায় খুব কমসংখ্যক কালভার্ট করা হয়েছে। যেগুলো হয়েছে, তার অনেকগুলো আবার সঠিক স্থানে নয়। ফলে নিচু এলাকার পানি আটকে যাচ্ছে। সেই পানি এখন সড়ক ডুবিয়ে বসতবাড়িতে ঢুকছে।
ঈদগাঁওয়ের নাসির উদ্দিন জানান, চকরিয়া থেকে কক্সবাজার সদর পর্যন্ত রেললাইন অনেক জায়গায় কার্যত বাঁধের মতো কাজ করছে। পানি চলাচলের সুবিধা বিবেচনায় আরও বেশি কালভার্ট প্রয়োজন ছিল। জমে থাকা পানি এখন কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশও প্লাবিত করছে।
চকরিয়া শান্তিবাজার এলাকার আবদুল হক বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে এলাকাটি পানিবন্দি-প্রশাসন কিংবা অন্য কারও সহযোগিতা আসেনি। রান্না বন্ধ থাকায় পরিবারের নারী-শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছি। মাতামুহুরী কোনাখালীর বাসিন্দা হারুন রশিদ বলেন, এ বছর বৃষ্টিতে বিলে যেমন পানি বেড়েছে, মাতামুহুরী নদীতেও তেমন পানি বেশি। প্রভাবশালীরা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে স্লুইসগেট বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
এদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে হাজারো যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। একই সময়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় জেলার সামগ্রিক দুর্যোগ পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও উদ্বেগজনক।
রাঙামাটি : টানা ভারি বর্ষণে পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির দীঘিনালা-সাজেক সড়কের মাচালং ও বাঘাইহাটবাজার এলাকায় রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে ৫৬১ পর্যটক আটকা পড়েন। সাজেকে আটকাপড়া পর্যটক সবাইকে সেনাবাহিনীর বিশেষ উদ্যোগে পানিতে ডুবে থাকা সড়কগুলোতে নৌকা ও বাঁশের ভেলার মাধ্যমে পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়। বৃহস্পতিবার ১৫০ জন পর্যটক সাজেক ছাড়েন। শুক্রবার সকালে ছেড়েছেন বাকি ৪১১ জন।
এদিকে দুর্যোগপূর্ণ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি : বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এখনো যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। মহালছড়ি উপজেলায় একটি সেতু তলিয়ে যাওয়ায় মুবাছড়ি এলাকার সঙ্গে উপজেলা সদরের সরাসরি যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দীঘিনালা উপজেলার মাইনী নদীর পানিও কমছে। তবে নিম্নাঞ্চল হওয়ায় মেরুং ইউনিয়নের ২০ গ্রাম প্লাবিত রয়েছে।
এদিকে বন্যার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। মহালছড়ি-গুইমারা সড়কের সিন্দুকছড়ি এবং খাগড়াছড়ি শহরের শালবন, কুমিল্লাটিলা ও হরিনাথপাড়া গ্যাপ এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার অনুরোধ করলেও অধিকাংশ লোকজন বাড়ি ছেড়ে যায়নি।
বান্দরবান : বৃষ্টি কমায় বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে বন্যার পানি নেমে যাচ্ছে ধীরগতিতে। শুক্রবারও বান্দরবান জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ দ্বিতীয় দিনের মতো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বান্দরবান-কেরানীহাট, চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের তিনটি স্থানে এবং বান্দরবান-বাঙালহালিয়া রাঙামাটি সড়কের কয়েকটি স্থানে সড়কে বন্যার পানি ওঠায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সাতটি উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় পাহাড়ধসে ও সড়কের ওপর মাটি জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে জানিয়েছেন পরিবহণ শ্রমিকরা।
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) : আট দিনের বৃষ্টিতে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। বাড়িঘরের আঙিনা ও আশপাশে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে গিয়ে মাছ ভেসে যাওয়ায় খামারি ও গৃহস্থরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জলাবদ্ধতার কারণে আমন মৌসুমের চাষাবাদও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মৌলভীবাজার : অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। জেলার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলায় ১৭টি ইউনিয়নের মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর ভাঙনে তিনটি ইউনিয়নের ৭-৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাজনগর উপজেলায় মনু নদীর বাঁধ ভাঙনে টেংরা, কামারচাক, মনসুরনগর ও পাঁচগাঁও, কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডি, সদর, হাজিপুর ও শরীফপুর এবং সদর উপজেলার মনুমুখ, কামালপুর, আখাইলকুড়া, চাঁদনীঘাট, কনকপুর ও পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে।
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) : কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর সীমান্তের ওপার থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উজিরপুর ও ভাংগারহাট এবং কুলাউড়া উপজেলার ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর ও আকুয়া মনু বাঁধের ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এদিকে বন্যার পানিতে টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের আসরাফ আলী আসইয়ের (৭২) মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার সকালে লাশ পানিতে ভাসতে দেখে স্থানীয়রা উদ্ধার করেন।
হবিগঞ্জ : টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়ছে। এতে খোয়াই নদীর বাঁধ দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করায় ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে কালীগঞ্জ এলাকায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় লোকজন নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। শুক্রবার বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ জি কে গউছ এমপিসহ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তরা। বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন জি কে গউছ। দুর্গত মানুষজনের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়।
প্রথম আলো
‘দেশে সন্তান জন্মদানের হার বেড়েছে’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, প্রতি ১০ জন মা মোট ২৩ জন সন্তানের জন্ম দিতেন। আর এখন সেই সংখ্যাটা হয়েছে ২৪। বাড়ল মাত্র একজন, কিন্তু সেটাই বড় এক চাপ এবং ঝুঁকির আলামত হয়ে এসেছে। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতির মধ্যে বিপদ দেখছেন।
একটি জরিপ বলছে, দেশে প্রথমবারের মতো মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) সামান্য বেড়েছে। অর্থাৎ মায়েদের গড় সন্তানসংখ্যা কিছু বেড়েছে।
পাশাপাশি এক দশকের বেশি সময় ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত জনবলসংকট চলছে, সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহ নেই, অনেক দম্পতি প্রয়োজনের সময় তা পাচ্ছেন না।
সংকট বিশেষভাবে প্রকট হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিক থেকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলজুড়ে। এখনো সংকটগুলো দূর করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিএফআর বাড়ার পেছনে রয়েছে এসব সংকট।
একজন নারী প্রজনন বয়সে (১৫ থেকে ৪৯ বছর) যত সন্তানের জন্ম দেন, সেটাই টিএফআর। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফ ও বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ জরিপ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) বলছে, দেশে টিএফআর এখন ২ দশমিক ৪। অর্থাৎ একজন মায়ের গড়ে ২ দশমিক ৪টি করে সন্তান হচ্ছে। এর আগে টিএফআর ছিল ২ দশমিক ৩।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফী আহমদের মতে, এটুকু বৃদ্ধিই উদ্বেগজনক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা ও গভীর বিশ্লেষণ দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের একাধিক শিক্ষক তাঁদের লেখায় ও প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
টিএফআর বেড়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়—এমন কথা বলেছেন জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ), জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জনসংখ্যাবিষয়ক কর্মকর্তা আর গবেষকেরাও।
উদ্বেগের কারণ একাধিক। প্রথমত, এর মানে মা-প্রতি সন্তান জন্মদান বাড়ছে। দেশে প্রজননবয়সী মায়ের সংখ্যা সাড়ে চার কোটির মতো। ফলে জনসংখ্যার চাপ আরও বাড়বে। দ্বিতীয়ত, এই প্রবণতাকে দুর্বল পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের আলামত বলা যায়।
এই মুহূর্তে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত ২৭ শতাংশ পদ খালি। নতুন নিয়োগ বন্ধ আছে। মাঠপর্যায়ে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সংকট প্রবল। বাজারে এসব সামগ্রীর দাম চড়া। জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড নেই। এই অবস্থা চললে টিএফআর আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
স্বাধীনতার পরের সরকারগুলো জনসংখ্যাকে দেশের উন্নয়নে বাধা হিসেবে বিবেচনা করেছিল। দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) এটাকে সবচেয়ে জটিল বাধা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বলা হয়, জনসংখ্যা বাড়ার উঁচু হার সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের উচিত জন্মনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ বিললাল হোসেন বলছেন, নগররাষ্ট্রগুলো বাদ দিলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনঘনত্বের দেশ বাংলাদেশ। একটি লম্বা সময় টিএফআর না কমে স্থিতিশীল ছিল। তখনো কিন্তু জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে।
প্রথম আলোকে এই অধ্যাপক বলেন, ‘সর্বশেষ দেখা যাচ্ছে টিএফআর স্থিতিশীল অবস্থা থেকে বাড়ার দিকে। আমরা ধারণা করছি নিকট ভবিষ্যতে এই প্রবণতাই দেখা যাবে। এটা বাংলাদেশের জন্য খারাপ ইঙ্গিত বহন করে।’
কালের কণ্ঠ
‘বন্যায় বিপর্যস্ত আট জেলা’-এটি দৈনিক কলের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের চার জেলা, সিলেট বিভাগের দুই জেলা ও উত্তরাঞ্চলের দুই জেলা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে একজন এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে তিন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের চকরিয়ায় বানের পানিতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুধু কক্সবাজারেই সাত দিনে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে ২৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। কক্সবাজারের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা: ঢাকা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সব নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। গত পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দি রয়েছে চট্টগ্রামের অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে। হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, মুহুরী, ফেনী ও সেলোনিয়া নদীর পানি সমতলে হ্রাস পেয়েছে।
ফেনী ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি হতে পারে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে। উজানে বৃষ্টি কমে আসায় সাঙ্গু নদীর বান্দরবান পয়েন্টে গতকাল শুক্রবার ৪৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে গতকাল বিপত্সীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। মাতামুহুরী নদী লামা পয়েন্টে ১০৭ সেমি কমে বিপত্সীমার ৪৭ সেমি ওপরে এবং চিরিংগা পয়েন্টে ১৭ সেমি কমে বিপত্সীমার ৩২ সেমি ওপর দিয়ে বইছিল।
কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের অভ্যন্তরে টানা ও উজানের ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতে দেশে নদ-নদীর পানি বেড়েছে।
চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে কিছুটা উন্নতির আশা থাকলেও সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি হতে পারে। মনু নদী মৌলভীবাজারে ২৫ সেমি বেড়ে বিপত্সীমার ৮০ সেমি ওপরে গতকাল বিপত্সীমার ৩৫ সেমি ওপরে বইছিল। কুশিয়ারা নদীর মারকুলি পয়েন্টে ৭ সেমি বেড়ে বিপত্সীমার ১৮ সেমি ওপরে এবং ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ২১ সেমি বেড়ে বিপত্সীমার ১০ সেমি ওপর দিয়ে বইছিল। সংস্থাটি জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতলে বেড়েছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার তিস্তা নদীর পানি সমতলে বেড়ে কিছু স্থানে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছিল। নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও বন্যা পরিস্থিতি হতে পারে।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘চট্টগ্রামসহ ৫ জেলায় দুর্যোগ সুপেয় পানির সংকট’। খবরে বলা হয়, কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চুলা ধরানোর জায়গা নেই। তাই দুর্গত এলাকার কয়েক লাখ মানুষ খাবার ও সুপেয় পানির সংকট পোহাচ্ছে। নারী ও শিশুসহ ৩০ হাজার ৫৮৫ জন উঠেছে আশ্রয়কেন্দ্রে। চট্টগ্রাম বোর্ডের আজ শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানো এবং তাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল শুক্রবার পানিতে ডুবে চার শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে গত ছয় দিনে ৩৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের।
চট্টগ্রামের সাতটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে দক্ষিশ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার অবস্থা করুণ। হাজার হাজার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বুকসমান পানিতে ডুবে গেছে। পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা মৎস্য প্রকল্প ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। রান্নার চুলায় হাঁড়ি উঠছে না। নলকূপ পানিতে ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির হাহাকার দেখা দিয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও। বন্যার মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের কোথাও কোথাও বেড়িবাধ ভেঙে পড়ছে- এই খবরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত জেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গতদের জন্য ৬৭০০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২০ হাজার ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, আশ্রয়াকেন্দ্রে যাওয়া মানুষের খাসা ও স্বাস্থা সুরখায় বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
আশ্রয় নেওয়াদের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড় এবং শিশুদের জন্য বিশেষ খাবার হিসেবে মাফিন, কেক ও বিছুটসহ ওরস্যালাইন এবং পাঁচ দিটর কার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে এবং প্রবীণ ও অজ্ঞসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় মেডিকেল সাপোর্ট নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ৫ জুলাই থেকে গতকাল ১০ রূপটি পর্যন্ত ছয় দিনে চট্টজামে বৃষ্টিপাত হয়েছে এক হাজার ১৯৭৫ মিলিমিটার! গত চার দশকে চট্টগ্রামে এটি সবচেয়ে
বেশি বৃষ্টিপাতের রোকর্ড।
পানিতে ডুবে মৃত্যু তিন শিশুর
ঢলের পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে বাশখালী উপজেলার বাহারহড়া ও সরল ইউনিয়নে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওই তিন শিশু হলো বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গমের মেয়ের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ আশিক (৭), একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার মোহাম্মদ মিরাজ (৩) এবং সরল ইউনিয়নের জালিয়াখালী এলাকার এক শিশু।
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির করণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় আজ শনিবার অনুষ্ঠেয় এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরে জানানো হবে গতকাল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. পারভেজ সাজ্জাদ চোধুরী স্ব অরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের ওই পাঁচ জেলায় শনিবারের অলিম, এইচএসসি বিএমটি, ভোকেশনাল ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে
ইত্তেফাক
‘১২ জেলায় বন্যার শঙ্কা, ভারী বৃষ্টিপাত মঙ্গলবার পর্যন্ত’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সারা দেশে বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলাতে ইতোমধ্যে অস্থায়ী বন্যা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান ভারী বৃষ্টিপাত ১৪ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে নতুন একটি মৌসুমি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও বেশি জলীয়বাষ্প প্রবেশ করতে পারে এবং ১৩ জুলাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগ, সিলেট বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলের প্রভাবে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। একই সময়ে কয়েকটি জেলার বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতির সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত কেন্দ্রটির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে। তবে ফেনী ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলেও বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে। তবে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলেও বন্যার ঝুঁকির কথা জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষকে পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রাখতে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেন, ‘বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে সাঙ্গু, মাতামুহুরি, খোয়াই এবং কুশিয়ারার পানি কমতে শুরু করেছে। এতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার শঙ্কা দেখছে না বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র এবং রবিবার থেকে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।’
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং আগামীকাল রবিবার পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকলেও এরপর ধীরে ধীরে কমতে পারে।
এদিকে, রাজধানীতেও বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে এবং গত তিন দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘বন্যার ধকল দীর্ঘ হচ্ছে’। খবরে বলা হয়, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিতে কাবু দেশের বেশির ভাগ এলাকা। এর মধ্যে চার দশকের রেকর্ড বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্যাঞ্চল। লাখ লাখ পানিবন্দী মানুষ প্রচণ্ড দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সাথে যুক্ত হয়েছে পাহাড়ধস আর শহর এলাকায় জলাবদ্ধতার ভোগান্তি। এ ছাড়া ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে বৃহত্তর সিলেটে ব্যাপক বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়ও। সার্বিক পরিস্থিতিতে বন্যাদুর্গত অঞ্চলে মানুষের ধকল দীর্ঘ হতে যাচ্ছে। এ দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পরিস্থিতিবিষয়ক পূর্বাভাসে দেশের অন্তত পাঁচ নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির জন্য চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পাঁচ জেলায় আজ শনিবারের এইচএসসি, কারিগরি ও মাদরাসা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায় বন্যার এখনো উন্নতি নেই। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়া মানুষের কষ্টের দিন কাটছে না। কক্সবাজারেও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। জেলার চকরিয়ায় পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মৌলভীবাজারের রাজনগরে ঢলের পানিতে ভেসে এক বৃদ্ধের মৃত্যু ঘটেছে।
গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি ঝরেছে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গায় ২১১ মিলিমিটার। আর আমবাগানে বৃষ্টি হয়েছে ১৫৩ মিলিমিটার। যদিও আগের দিনের চেয়ে বৃষ্টি অর্ধেকে নেমেছে। এ দিকে রাজধানীতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। গত তিন দিন থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরেছে। বৃষ্টির কারণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
বিপদসীমার ওপরে ৫ নদীর পানি
নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
গতকাল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পরিস্থিতিবিষয়ক পূর্বাভাসে বলা হয়, সকাল ৯টার তথ্যানুযায়ী দেশের পাঁচ নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সাঙ্গু নদীর পানি বান্দরবান পয়েন্টে ৯৫ সেন্টিমিটার, দোহাজারি (চট্টগ্রাম) পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মাতামুহুরী নদীর পানি লামা (বান্দরবান) পয়েন্টে ৪৭ সেন্টিমিটার, চিরিঙ্গা (কক্সবাজার) পয়েন্টে ৩২ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এ ছাড়া সিলেটে কুশিয়ারা নদীর পানি মারকুলি (সুনামগঞ্জ) পয়েন্টে বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার, ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মনু নদীর পানি মনু রেলব্রিজ (মৌলভীবাজার) পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার, মৌলভীবাজার পয়েন্টে ৮০ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর খোয়াই নদীর পানি বল্লা (হবিগঞ্জ) পয়েন্টে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অন্য দিকে সকাল ৯টা পর্যন্ত আরো পাঁচ নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থায় প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া (নীলফামারী), কাউনিয়া (লালমনিরহাট) ও তারাপুর (গাইবান্ধা) স্টেশনে বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
আর সিলেটে কুশিয়ারা নদী শেরপুর (মৌলভীবাজার) স্টেশনে, সুরমা নদী কানাইঘাট (সিলেট), ছাতক (সুনামগঞ্জ) ও সুনামগঞ্জ স্টেশনে, সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে এবং ছোট ফেনী নদী কোম্পানিগঞ্জ (নোয়াখালী) স্টেশনে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।
বণিক বার্তা
‘এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি বেড়েছে ৩২%’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে জ্বালানির ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্প ও খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে বাংলাদেশ।
আর সেটি পর্যায়ক্রমেই বাড়ছে বলে লন্ডনভিত্তিক বৈশ্বিক গ্যাস শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়নের (আইজিইউ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি ৩২ শতাংশ বেশি হয় বলে সংস্থাটির প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যা পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অস্বীকার করেননি। তাদের ভাষ্য, স্থানীয় গ্যাসের ঘাটতি মোকাবেলায় এলএনজি আমদানি বেড়েছে।
আইজিইউর তথ্য অনুসারে, এলএনজি সরবরাহ করে বিশ্বের এমন উৎস ও হাব হিসেবে পরিচিত দেশগুলো থেকেই বাংলাদেশে বাড়ছে জ্বালানিটির আমদানি। ২০২৫ সালে বিশ্বের ১২টি দেশ থেকে বাংলাদেশে এলএনজি এসেছে। আমদানীকৃত এ গ্যাসের পরিমাণ ৭ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন টন। এর আগে ২০২৪ সালে আমদানি করা হয় ৫ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন টন এলএনজি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন টন বেশি আমদানি করা হয়।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এলএনজি আমদানি হয়েছে ১ দশমিক ৪২ মিলিয়ন টন, যা বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবারই সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে এশিয়ার বৃহৎ আমদানিকারক দেশ চীন, ভারত ও পাকিস্তানের এলএনজি আমদানি একই সময়ের ব্যবধানে কমেছে। চীন ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আমদানি কমিয়েছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ, ভারত ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ও পাকিস্তান ১০ দশমিক ৫ শতাংশ আমদানি কমিয়েছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করেছে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে উপসাগরীয় দেশ কাতার থেকে। দেশটি থেকে এলএনজি আমদানি হয়েছে ৪ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন টন। কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি রয়েছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের কাতার এনার্জির সঙ্গে পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানি চুক্তি সইয়ের পর থেকে কম-বেশি প্রতি বছর ৪০ কার্গো এলএনজি আসে দেশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাতার থেকে ৪০ কার্গো এলএনজি এসেছে দেশে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়েছে কাতার এনার্জি। কারণ দেশটির বৃহৎ এলএনজি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ উৎস থেকে চুক্তির সব কার্গো আমদানি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়ন প্রতিবেদন অনুসারে, কাতারের পর দ্বিতীয় এলএনজি সরবরাহকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। দেশটি থেকে ১ দশমিক ৪২ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আঙ্গোলা থেকে দশমিক ৭ মিলিয়ন টন, অস্ট্রেলিয়া থেকে দশমিক ২৯ মিলিয়ন টন, গিনি থেকে শূন্য দশমিক ১২ মিলিয়ন টন, ইন্দোনেশিয়া থেকে দশমিক শূন্য ৮ মিলিয়ন টন, মালয়েশিয়া থেকে দশমিক ১৩ মিলিয়ন টন, আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে দশমিক ৩০ মিলিয়ন টন, নাইজেরিয়া থেকে দশমিক ১৪ মিলিয়ন টন, রাশিয়া থেকে শূন্য দশমিক ৩ মিলিয়ন টন, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাকো থেকে দশমিক ৮ মিলিয়ন টন এবং পুনরায় রফতানি গ্রহণকৃত এলএনজি দশমিক ৫৪ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘পাহাড়ধসে প্রতিবছর গড়ে ২৫ জনের মৃত্যু’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর গড়ে পাহাড়ধসের ২৩টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। আহত হয় অর্ধশত মানুষ। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের গত সাড়ে ১০ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, টিলা ও পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনের কারণে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটির মতো এলাকাগুলোয় প্রায়ই পাহাড়ধস ও মাটিচাপায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অপতৎপরতা, গাছ কেটে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করাসহ বিভিন্ন কারণেই পাহাড়ে ধসের ঘটনা ঘটছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সরকারি পরিসংখ্যান
অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এ বছর পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে ২৯টি। এসব ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয়েছে ৮৮ জন। এর আগের বছর ২২টি ঘটনায় ৬ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় ১০ জন। ২০২৪ সালে পাহাড়ধসের ২৩টি ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারায় ১৬ জন, আহত হয় ৩ জন। আর ২০২৩ সালে পাহাড়ধসের ৩৫টি ঘটনায় ১৫ জন মারা যায়, আহত হয় ২৩৪ জন। এ ছাড়া ২০২২ সালে ৫ জন, ২০২১ সালে ৬, ২০২০ সালে ১৪, ২০১৯ সালে ১৩, ২০১৮ সালে ৪৫, ২০১৭ সালে ৯১ এবং ২০১৬ সালে ৩৯ জন প্রাণ হারায়।
২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে দেশে ২৪৩টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে, গুরুতর আহত হয়েছে ৫২৯ জন। অর্থাৎ প্রতিবছর দেশে গড়ে ২৩টি ঘটনায় ২৫ জনের মতো মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া পাহাড়ধসে প্রতিবছর গড়ে ৫১ জনের বেশি গুরুতর আহত হয়। আর হতাহতদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই পুরুষ।
গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ও মাটিচাপায় চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে গত বৃহস্পতিবার সংসদে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ৫ জন, কক্সবাজারে ১৯, রাঙামাটিতে ১ এবং বান্দরবানে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পাহাড়ধসের কারণ
দেশে প্রতিবছর বর্ষাকালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানি এড়ানো যাচ্ছে না। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, পাহাড় মানুষের বসবাসের জন্য না। কিন্তু প্রতিবছর সেখানে বাড়িঘর উঠছে। পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি, রাস্তা তৈরি হচ্ছে। এতে পাহাড় তার প্রাকৃতিক গঠন হারিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ধসে পড়ছে।
আলী আহাম্মেদ খান বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের সামনেই এসব হচ্ছে, এখানে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের শিথিলতা আছে, তারা কঠোর হলে এগুলো হতো না। কিন্তু তারা কঠোর হচ্ছে না। তা ছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এসব বিষয়ে উদাসীন। তারা পাহাড় কাটা ও বসতি স্থাপনে নেপথ্যে থেকে কাজ করে। তাই প্রকৃতি, গাছপালা, পাহাড় ও মানুষ সবই হারাচ্ছি আমরা।’ এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনীতিকদের ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন আলী আহাম্মেদ খান।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, পাহাড়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের যারা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। যখন বৃষ্টি হয়, তখন নিম্ন আয়ের এসব মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
আলী আহাম্মেদ খানের মতে, আশ্রয়হীন ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম খরচে থাকার সুযোগ থাকায় পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোই তাদের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে। জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকলেও বিকল্প আবাসনের অভাব এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এসব এলাকা ছাড়তে পারে না।
অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে এসব বসতি নির্মাণ করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শুধু পার্বত্য তিন জেলাই নয়, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরাঞ্চলেও পাহাড়সংলগ্ন অসংখ্য বসতি এখন ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।
দেশ রূপান্তর
‘মন্ত্রিসভায় রদবদলের সম্ভাবনা আগস্টে’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পাঁচ মাস পার হতে চলেছে। আগস্টে সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হবে। এই সময়ে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন ও রদবদল আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
সূত্র বলছে, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের কাজের চাপ কমাতে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হতে পারে। অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকা মন্ত্রণালয়গুলোতেও রদবদলের সম্ভাবনা রয়েছে। আবার মন্ত্রিসভার আকার কিছুটা বাড়তে পারে।
বিষয়টি নিয়ে সরকারের একাধিক মন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তারা বলছেন, মন্ত্রিসভায় রদবদল কিংবা দপ্তর পুনর্বণ্টনের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেখছেন। এ বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই।
জাতীয় নির্বাচনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে নতুন সরকার। মন্ত্রিসভার এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মন্ত্রিসভার সদস্যদের দায়িত্বের প্রাথমিক মেয়াদ ছয় মাস। সব মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। ছয় মাস পর এটি পর্যালোচনা করা হবে। এতে বাদ পড়তে পারেন মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য। যুক্ত হতে পারে নতুন মুখ।’
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানান, বর্তমান মন্ত্রিসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কাজের ধীরগতির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে। ইতিমধ্যে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়া হতে পারেÑ এমন আলোচনাও চলছে। এ ছাড়া কর্মদক্ষতা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য বিবেচনায় কয়েকজন মন্ত্রীর দপ্তর বদল বা দায়িত্ব কমানো হতে পারে। বিশেষ করে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকা মন্ত্রণালয়গুলোতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন মন্ত্রী হিসেবে মাহিদুর রহমান, এরশাদ উল্লাহ, এবিএম মোশাররফ হোসেন এবং সেলিমা রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, বৃহত্তর নোয়াখালী থেকে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বরকত উল্লা বুলু, জয়নুল আবদিন ফারুক আসতে পারেন মন্ত্রিসভায়। টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেলের নামও আছে আলোচনায়।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘সংবিধানে আসছে পরিবর্তন’-এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সংবিধানের বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশবিশেষ অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করে বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছেন তা নিয়ে সারা দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সুশীল সমাজ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও দেশের জন্য বিষয়টি ইতিবাচক হবে বলে মন্তব্য করছেন। তাঁদের মতে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিবর্তন কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোটের বিধান এবং সংবিধানের কিছু ‘অসংশোধনীয়’ ধারা নিয়ে নতুন করে আইনগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখায় আমরা খুশি। আমরা আনন্দিত। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের এই উৎকৃষ্ট পদ্ধতি পুনর্বহালের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় পুরো জাতিই উৎফুল্ল।’
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সংসদকে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদে আনুষ্ঠানিক সংশোধন এনে আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। এজন্য সরকার সংসদে একটি সমন্বিত সংবিধান সংশোধন বিল আনতে পারে। সেই বিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোট, ৭ক, ৭খ, ৪৪(২) অনুচ্ছেদসহ আদালতের পর্যবেক্ষণের আলোকে প্রয়োজনীয় সব পরিবর্তন একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। রায়ের পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সংসদের কাজ হবে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধানের ভাষা পুনর্গঠন করা।’ তাঁর মতে ‘শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; আদালত যেসব বিধান অসাংবিধানিক বলেছেন, সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত সব অনুচ্ছেদে সমন্বয় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি না হয়।’ তিনি বলেন, ‘আদালত কোনো আইনকে অসাংবিধানিক বা বেআইনি ঘোষণা করতে পারেন কিন্তু নতুন আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধন করতে পারেন না। এটি একমাত্র জাতীয় সংসদের এখতিয়ার। এজন্য রায়ের আলোকে কোনো কিছুই অটোমেটিক পুনর্জীবিত হয়ে যাবে না, সংসদে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।’
এ বিষয়ে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ে হাই কোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিধানগুলোও বাতিল হয়েছে। তবে এর ফলে সংবিধানে কিছু আইনি ও কারিগরি অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, যার সমাধান সংসদকেই করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘হাই কোর্ট সব সংশ্লিষ্ট বিধান বাতিল করেননি। ফলে উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার শপথ এবং বিচারপতির প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধানগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। পাশাপাশি সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বর্তমান বিধান বহাল থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনেও জটিলতা তৈরি হবে।’ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে এবং প্রয়োজনে রিভিউ আবেদন করা হতে পারে বলেও জানান তিনি। যেসব অনুচ্ছেদে সংশোধন আনতে হবে : সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে যুক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। হাই কোর্ট সেই বাতিলের অংশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন এবং আপিল বিভাগ তা বহাল রেখেছেন। এর ফলে সংবিধানের ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ, ৫৮ঙসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধান পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। তবে আদালতের রায়ের আলোকে এ ব্যবস্থার কাঠামো, উপদেষ্টা নিয়োগ পদ্ধতি এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ক্ষমতা বিষয়ে সংসদ নতুন ভাষায় বিধান প্রণয়ন করতে পারে বলেও মত রয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। হাই কোর্ট রায়ে ওই অংশ বাতিল করে গণভোট ব্যবস্থা পুনর্বহাল করেন, যা আপিল বিভাগ বহাল রেখেছে। ফলে সংবিধানের মৌলিক কিছু বিষয় সংশোধনের ক্ষেত্রে আবারও জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন সংসদকে ১৪২ অনুচ্ছেদের ভাষা পুনর্গঠন করে গণভোট আয়োজনের পদ্ধতি, ক্ষেত্র ও সীমা নির্ধারণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হতে পারে। হাই কোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ের মাধ্যমে সংযোজিত ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেছিলেন। ৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল বা স্থগিতের অপরাধের শাস্তি এবং ৭খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের কিছু অংশকে সংশোধন-অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। আপিল বিভাগের রায়ে সেই অবস্থান বহাল থাকায় এসব অনুচ্ছেদ কার্যত সংবিধান থেকে অপসারণ বা পুনর্লিখনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ৭খ বাতিল হওয়ার ফলে সংসদের সংশোধন ক্ষমতার ওপর আরোপিত সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন নতুনভাবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ৪৪(২) অনুচ্ছেদও হাই কোর্ট বাতিল করেছিলেন।
সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে হবে সংবিধান সংশোধন : তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে হলে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা সংসদের ভোট ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ আদালত আইনি ও সাংবিধানিক দিক পর্যালোচনা করলেও রাজনৈতিক ও নীতিগত এই বড় সিদ্ধান্তের ভার আইনসভার ওপরেই ছেড়ে দিয়েছেন। এ কারণে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে হলে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৯৯, ১২৩, ১৪৭, ১৫২ এবং তৃতীয় তফসিলে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা সংশোধন করতে হবে। এর বাইরে রায়ের পর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের নীতি, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৯, ১১, ১২ ও ২৫ অনুচ্ছেদসহ নীতির বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পরিপূর্ণভাবে সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করতে শিগগিরই গঠন করা হবে সংবিধান সংশোধন কমিটি। বিএনপি নেতৃত্বতাধীন সরকারদলীয় ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের সদস্যদের নিয়ে ওই কমিটি গঠন করা হবে। বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালতের রায়ের পর এ নিয়ে কাজ করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন এমন কয়েকজন দায়িত্বশীল সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘সংসদের মাধ্যমে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। এটা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এটা মানতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলো নেওয়া হবে।’ এ প্রসঙ্গে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছেন তার অনেক দিক রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম সংবিধান সংশোধন। এটা সংসদের মাধ্যমে করতে হবে। সংবিধান তো বাববার সংশোধন করা যায় না। একবার সংশোধন করলে এর মেয়াদ অন্তত ২০ থেকে ২৫ বছর স্থায়ী হয়। এসব চিন্তা করে খুব শিগগরিই একটি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওই কমিটির মাধ্যমে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের দিক বিচার, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে সংশোধন করা হবে।’
একই প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আগামী সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল পাস করা হবে। বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন চলছে। ১৫ জুলাই পর্যন্ত অধিবেশন চলার কথা। এরপর দুই মাসের মধ্যে তৃতীয় অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, ‘সংসদের মাধ্যমে এটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল। তবে বিচার বিভাগের মাধ্যমে ফিরে আসায় সংসদের জন্য সুবিধা হয়েছে। কারণ সংসদে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন রয়েছে। পাশাপাশি বিরোধী দলে থাকা জামায়াতেরও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আগে থেকে সমর্থন ছিল। সব মিলিয়ে এ ব্যবস্থা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে বলে মনে করি।’
