এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো পুরো কিউবায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। সন্ধ্যার ঠিক আগে দ্বীপজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে জানায় দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থা ইউনিয়ন ইলেকট্রিকা দে কিউবা। এই সংস্থা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনা করে। এবারের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ জানানো হয়নি। তবে এর মাত্র কয়েক দিন আগেই সোমবার একই ধরনের দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। এর ফলে চলতি বছরে কিউবায় মোট চারবার সারা দেশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটল। এর মধ্যে মার্চ মাসে দু’বার সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
কিউবায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট নতুন কিছু নয়। দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বড় অংশই ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালের শীতল যুদ্ধের সময় নির্মিত হওয়ায় এখন তা অনেক পুরোনো ও জরাজীর্ণ। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কার্যত কিউবার বিদেশি তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। কিউবা বহু দশক ধরেই বিশ্বের দীর্ঘতম বাণিজ্য অবরোধের মুখে রয়েছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে অধিকাংশ বাণিজ্য বন্ধ রেখেছে। অথচ দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের উপকূল থেকে মাত্র প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প কিউবার কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেন। সমালোচকদের অভিযোগ, হাভানার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভিন্নমত দমনে সহিংস পন্থা অবলম্বন করে। ৩ জানুয়ারি ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনুমোদন করেন। সমাজতান্ত্রিক নেতা ও কিউবার ঘনিষ্ঠ মিত্র মাদুরোকে ওই অভিযানে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তিনি মাদক ও অস্ত্র-সংক্রান্ত অভিযোগে সেখানে কারাবন্দি। মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলা আর কিউবায় তেল বা অর্থ পাঠাবে না। এরপর থেকে তার প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
এরপর ২৯ জানুয়ারি ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে ঘোষণা করেন, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি। ওই আদেশে তিনি কিউবায় জ্বালানি সরবরাহকারী যেকোনো দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। এর পর থেকে মাত্র একটি রুশ তেলবাহী ট্যাংকার কিউবায় পৌঁছাতে পেরেছে, সেটিও মার্চ মাসে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কিউবা নিজেদের চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ তেল উৎপাদন করত। বাকি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জ্বালানির এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট কিউবার সাধারণ মানুষের জন্য গুরুতর মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কারণ, পরিবহনসহ বিভিন্ন জনসেবা খাত ইতিমধ্যেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জুন মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক জানান, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে কিউবায় শিশু মৃত্যুর হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকে আরোপিত জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো একসঙ্গে কিউবার জনগণের, বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের, ওপর সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য কিউবা সরকারের অব্যবস্থাপনাই দায়ী। মার্চ মাসে আল জাজিরা’কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আমরা কিউবার সরকারের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিইনি।
জ্বালানি অবরোধের আগে কিউবা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে চেয়েছিল। বর্তমানে চীনের সহায়তায় আমদানি করা সৌর প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই রূপান্তরের গতি আরও বাড়ানো হয়েছে। তবু ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, কিউবার মোট জ্বালানি ব্যবহারের মাত্র প্রায় ১৮ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে দেশটি।
