কেন মশা কিছু মানুষকে অন্যদের তুলনায় বেশি কামড়ায়?

বিবিসির প্রতিবেদন

কেন মশা কিছু মানুষকে অন্যদের তুলনায় বেশি কামড়ায়?

ফন্ট সাইজ:

অনেক দূর থেকেই মশা মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া বিভিন্ন সংকেত পড়তে পারে। তারপরই তারা ঠিক করে কাকে কামড়াবে। তাহলে কি আপনিও মশার ‘হিট লিস্টে’ আছেন?
আমি যেন মশার সবচেয়ে প্রিয় শিকার।
গ্রীষ্মের ছুটিতে পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেন, একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত। মশা আমাকে অবশ্যই কামড়াবে। আর সেই কামড়ে বড় বড় চুলকানিযুক্ত ফোলা দাগ হয়। তা সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকে। অথচ আমার সঙ্গে থাকা অনেকের গায়ে একটি মশাও বসে না। আর যাদের কামড়ায়ও, তাদের শরীরে থাকে শুধু ছোট্ট একটি লাল দাগ। বন্ধুরা প্রায়ই মজা করে বলে, আমার রক্ত নাকি ‘অস্বাভাবিক মিষ্টি’।
আসলে বিষয়টি পুরোপুরি ভুলও নয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের শরীর থেকে নির্গত বিভিন্ন জৈবিক সংকেত- যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস ও শরীরের গন্ধ নির্ধারণ করে কে মশার কাছে কতটা আকর্ষণীয়। কারও ক্ষেত্রে এসব সংকেত এতটাই শক্তিশালী হয় যে মশা সহজেই তার দিকে ছুটে আসে। নিচে তুলে ধরা হলো, মশা কীভাবে তাদের শিকার খুঁজে বের করে।

কার্বন ডাই-অক্সাইড জানিয়ে দেয় আপনি কোথায়
শুধু স্ত্রী মশাই মানুষকে কামড়ায়। কারণ ডিম উৎপাদনের জন্য তাদের রক্তের প্রোটিন দরকার হয়। প্রায় ১০ মিটার দূর থেকেই তারা চোখ ও ঘ্রাণশক্তির মাধ্যমে মানুষকে শনাক্ত করতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হলো মানুষের নিঃশ্বাস ও ত্বক থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড। মানুষের নিঃশ্বাসে থাকা এই গ্যাস মশার ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে এবং শিকার খোঁজার আচরণ শুরু করায়। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ শিশুদের তুলনায় বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। তাই শিশুদের তুলনায় বড়দের প্রতি মশার আকর্ষণ বেশি। এই কারণেই শুকনো বরফ বা বোতলজাত কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে মশার ফাঁদ তৈরি করা হয়।

শরীর যত গরম, আকর্ষণ তত বেশি
গবেষণায় দেখা গেছে, মশা শুধু কার্বন ডাই-অক্সাইড নয়, শরীরের তাপ ও আর্দ্রতার প্রতিও আকৃষ্ট হয়। এ কারণেই গর্ভবতী নারীরা অন্য নারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি মশার আকর্ষণের কেন্দ্র হন। গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকক্রিয়া বেড়ে যায়, ফলে বেশি তাপ উৎপন্ন হয় এবং বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হয়। বৃটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য কীটতত্ত্বের অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডসে বলেন, গর্ভবতী নারীর শরীর যেন একটি ছোট চুল্লির মতো। তাদের শরীর বেশি গরম থাকে। ব্যায়াম করার সময় বা ঠিক পরে মানুষও সাময়িকভাবে মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ তখন শরীর বেশি গরম থাকে, ঘাম হয় এবং বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়। যাদের শরীরের আকার বড়, তাদের প্রতিও মশার আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

ত্বকের গন্ধই আসল রহস্য
মশা যখন মানুষের খুব কাছাকাছি আসে, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ত্বকের গন্ধ। স্টিভ লিন্ডসে বলেন, মূল বিষয়টি হলো গন্ধ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উড়ে যাওয়া রাসায়নিক পদার্থই পার্থক্য তৈরি করে। মশা আসলে রাসায়নিক সংকেতের জগতেই বাস করে। তিনি ও তার সহকর্মীরা যাদের রক্ত মিষ্টি, তাদের বেশি মশা কামড়ায়- এই প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, আসল বিষয় হলো মানুষের ত্বকের নিজস্ব গন্ধ। আমাদের ত্বকে থাকা অণুজীব বা স্কিন মাইক্রোবায়োম ত্বকের কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাটি অ্যাসিড ও প্রোটিন ভেঙে শত শত উড়ে যাওয়া রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে। এই যৌগগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং মশা সহজেই সেগুলো শনাক্ত করতে পারে। মানুষের ত্বকে এমন ৫০০টিরও বেশি রাসায়নিক যৌগ রয়েছে। এর মধ্যে অ্যামোনিয়া, ল্যাকটিক অ্যাসিড এবং বিশেষ করে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড মশাকে আরও বেশি আকর্ষণ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ৬৪ জন মানুষের ত্বকের গন্ধ সংগ্রহ করে মশার সামনে উপস্থাপন করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, যাদের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড বেশি ছিল, মশা তাদের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। গবেষকরা আরও দেখেছেন, সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তির প্রতি মশার আকর্ষণ সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় ব্যক্তির তুলনায় ১০০ গুণ বেশি ছিল। স্টিভ লিন্ডসে বলেন, মশার কাছে আপনি কতটা আকর্ষণীয়, তা অনেকটাই জন্মগত এবং দীর্ঘ সময় একই রকম থাকে।

মশার কামড় থেকে কীভাবে বাঁচবেন?
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল কীটতত্ত্বের অধ্যাপক হিদার ফার্গুসন বলেন, রসুন খাওয়া বা ভিটামিন বি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে মশা দূরে থাকে- এমন দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তিনি পরামর্শ দেন, ডিট (ডিইইট), পিকারিডিন বা পিএমডি সমৃদ্ধ কার্যকর মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন। কীটনাশকযুক্ত লম্বা হাতার পোশাক ও লম্বা প্যান্ট পরুন। ঘাম হলে বা অনেক সময় পেরিয়ে গেলে পুনরায় রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন।

ত্বকের ব্যাকটেরিয়াও গুরুত্বপূর্ণ
নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের প্রতি ম্যালেরিয়াবাহী মশা বেশি আকৃষ্ট হয়, তাদের ত্বকের ব্যাকটেরিয়ার ধরন অন্যদের তুলনায় আলাদা। এই ব্যাকটেরিয়াই মূলত শরীরের গন্ধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এমনকি যমজদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, অভিন্ন যমজদের প্রতি মশার আকর্ষণ প্রায় একই হলেও ভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ মশার কাছে আকর্ষণীয় হওয়ার বৈশিষ্ট্যের একটি অংশ বংশগতও হতে পারে।

সবাই একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না
সব মানুষের শরীর মশার কামড়ে একভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিন নির্ধারণ করে মশার কামড়ে কার শরীরে কতটা ফোলা, লালচে ভাব বা চুলকানি হবে। হিদার ফার্গুসন বলেন, অনেকেই মনে করেন তারা বেশি কামড় খাচ্ছেন, কিন্তু আসলে তাদের শরীরের প্রতিক্রিয়া বেশি তীব্র। আবার কেউ হয়তো অনেকবার কামড় খেলেও প্রায় কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখান না। অর্থাৎ কেউ কেউ জৈবিকভাবে মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হলেও, মশার দৃষ্টি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ কেউই নন। তাই ফার্গুসনের পরামর্শ, আপনি যদি মনে করেন মশা আপনাকে কামড়ায় না, তবুও অবশ্যই নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন