ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে ইরানের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে চিরবিদায় জানিয়েছে দেশটির কোটি কোটি শোকার্ত মানুষ। সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠানের মাধ্যমে গতকাল নিজ শহর মাশহাদে সমাহিত হন খামেনি। তাকে বিদায় জানাতে বরাবরের মতো শেষ মুহূর্তেও রাস্তায় ছিল লাখ লাখ শোকাবহ মানুষের ঢল। যুদ্ধ শুরুর প্রায় চারমাস পর গত শুক্রবার থেকে শুরু হয় আলি খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠান। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি মেহমানরা উপস্থিত ছিলেন। ইরান ছাড়াও ইরাকের একাধিক শহরে চলে শোকানুষ্ঠান ও গায়েবানা জানাজা। তার প্রতিটি জানাজায় ছিল অগণিত মানুষের সমাগম। বৃহস্পতিবার, মাশহাদে ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিন বিপুল জনতার মধ্য দিয়ে বহন করা হয়। জানাজা ও শোকানুষ্ঠান ঘিরে ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষ খামেনিকে চিরবিদায় ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
সপ্তাহব্যাপী খামেনির জানাজা ও অনুষ্ঠানে হাজার হাজার ইরানি জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নামেন। তাদের চোখে ছিল প্রিয় নেতাকে হারানোর ছাপ এবং সেøাগান ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-বিরোধী। অনেকে যুক্তরাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পবিরোধী লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ডও বহন করেছেন। তারা ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যা, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ধ্বংসের আহ্বান জানান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা জানিয়েছে, ৪৫টিরও বেশি দেশের রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ৯০টিরও বেশি দেশের পণ্ডিত, ধর্মীয় নেতা এবং বিজ্ঞানীরা খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়েছিলেন। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় প্রাণ হারান আলি খামেনি। সেদিন খামেনি ছাড়াও দেশটির কয়েক ডজন শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন। তবে সেদিন ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান আলি খামেনির ছেলে মোজতবা।
এরপর তিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে এখনো প্রকাশ্যে আসেননি মোজতবা খামেনি। এমনকি সপ্তাহব্যাপী তার বাবার শোকানুষ্ঠান, জানাজাতেও তিনি হাজির হতে পারেননি। এদিকে খামেনির জানাজা অনুষ্ঠান শুরু পর গত মঙ্গলবার থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী তিনটি কার্গো জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। এরপরেই দেশটি ইরানের ওপর অতর্কিতে হামলা শুরু করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরানে মঙ্গলবার ও বুধবার রাতে প্রায় ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ৮০টি এবং বুধবার রাতে ৯০টি টার্গেটে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার খামেনির দাফনের দিনেও মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা চালিয়েছে। ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বুশেহরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেদ্রে হামলা চালিয়েছে। প্রদেশটির এক উপ-গভর্নরের বরাতে গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সীমানায় আঘাত হেনেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। মার্কিন বাহিনীর এসব হামলার জবাবে গত দুইদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইরানি বাহিনী।
এর আগে বুধবার তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়, সমঝোতা কি এখন শেষ হয়ে গেছে? জবাবে তিনি বলেন, এটি খুবই আকর্ষণীয় প্রশ্ন। আমার কাছে মনে হয়, এটি শেষ। আমি তাদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে লিখেন, হুমকি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মূল্য যে এখন দিতে হয়, তা যুক্তরাষ্ট্র এখনো শিখতে পারেনি। পরিষ্কার করে বলছি- আপনি হামলা করলে পাল্টা হামলার মুখে পড়বেন। দেশ দুইটির পাল্টাপাল্টি এসব হামলায় গত ১৭ই জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দেয়ার আশা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।
