পঞ্চদশ সংশোধনীর রায় আপিলেও বহাল

বহাল হাইকোর্টের রায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ উন্মুক্ত

ফন্ট সাইজ:

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা তিনটি আপিল খারিজ করে দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। গতকাল প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ রায় দেন। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোট এবং সংবিধানের ৭(ক), ৭(খ) ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল থাকলো। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সাংবিধানিক পথ উন্মুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা মন্তব্য করেছেন। এদিন আপিল বিভাগে সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। তাকে সহায়তা করেন আইনজীবী কারিশমা জাহান ও রিদুয়ানুল করিম। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

অপর আপিলকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির। মামলায় ইন্টারভেনার (তৃতীয় পক্ষ) হিসেবে গণফোরামের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন এবং আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেনÑ অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ।
পঞ্চদশ সংশোধনী থেকে আপিল পর্যন্ত: ২০১১ সালের ৩০শে জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন জাতীয় সংসদে পাস করে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া এবং রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিÑ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনর্বহাল করা হয়।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দু’টি পৃথক রিট দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ই ডিসেম্বর হাইকোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বাতিলসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেন। একইসঙ্গে সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত সংবিধানের ৭(ক), ৭(খ) ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সুজনের সম্পাদকসহ চার ব্যক্তি পৃথকভাবে লিভ টু আপিল করেন। গত বছরের ১৩ই নভেম্বর আপিল বিভাগ আপিলের অনুমতি (লিভ) প্রদান করেন। পরে দায়ের করা তিনটি আপিলের শুনানি শেষে গতকাল সেগুলো খারিজ করে দেন আদালত।

পক্ষসমূহের বক্তব্য: আপিল বিভাগের রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এলেও সংবিধানে কিছু আইনি ও কারিগরি (টেকনিক্যাল) জটিলতা তৈরি হয়েছে, যার সমাধান জাতীয় সংসদকে করতে হবে। তিনি বলেন, এই রায়ের ফলে ভবিষ্যতে ‘দিনের ভোট রাতে হওয়ার’ সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে এবং প্রয়োজন হলে রিভিউ আবেদনও করা হতে পারে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতিদের রাখার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ করা উচিত নয়।

বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষ রাখতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার কাঠামো নতুনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আপিলকারীদের পক্ষে শুনানি করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের ফলে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আদালতের অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকলো। তিনি বলেন, আমরা যেসব বিষয়ে প্রতিকার চেয়েছিলাম, তার সব না পেলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে হাইকোর্টের রায় বহাল রয়েছে। গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আমরা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারণ করবো।

এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের ফলে হাইকোর্ট যে চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, সেগুলো বহাল রয়েছে। তার ভাষ্য, সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ কার্যকারিতা হারিয়েছে। একইসঙ্গে গণভোট পুনর্বহাল এবং নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেয়ার বিধান বাতিলের সিদ্ধান্তও বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা হয়েছিল। হাইকোর্ট সেই বিলোপকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন এবং আপিল বিভাগও তা বহাল রেখেছেন। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালে আর কোনো সাংবিধানিক বাধা নেই। তবে সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি-সংক্রান্ত কয়েকটি অনুচ্ছেদের বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত সংসদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে সংসদ: অ্যাটর্নি জেনারেল: সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখার ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। গতকাল আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা। অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, হাইকোর্টের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাতিল করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিলÑ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, গণভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া, সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব করার উদ্যোগ বাতিল এবং সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিল। তিনি বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ চার ব্যক্তি ও দু’টি সংগঠন আপিল করেছিল। তাদের দাবি ছিলÑ পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা।

তবে আপিল বিভাগ সেই আপিলগুলো খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকলো। রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে। তবে এটি আগের কাঠামোতেই থাকবে নাকি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন কোনো কাঠামো তৈরি হবেÑ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের রয়েছে। তিনি বলেন, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সংসদ যদি মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন, তাহলে সেই ক্ষমতা সংসদের রয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্তই আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, হাইকোর্ট সংশোধনীর নির্দিষ্ট চারটি বিষয় ছাড়া বাকি বিষয়গুলো সংসদের উপর ছেড়ে দিয়েছিল। তাই সংসদ প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধানকে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিতে পারে। ভবিষ্যতে কোনো সরকার আবারো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করতে পারে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ভবিষ্যতের বিষয় এখনই স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতকে বাঁধার মতো কোনো আইনি ব্যবস্থা কারও হাতে নেই। সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই অনুচ্ছেদে ভবিষ্যতে সংবিধানের কিছু পরিবর্তন নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু একটি সংসদ পরবর্তী সংসদের ক্ষমতা সীমিত করতে পারে না, আদালত এই যুক্তি গ্রহণ করেছেন। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান পরিবর্তন করলে তা স্থায়ী হয় নাÑ এই রায়ের মাধ্যমে এমন বার্তা পাওয়া গেল কিনা, এমন প্রশ্নে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ইতিহাসে দেখা যায়, অসৎ উদ্দেশ্যে করা কোনো উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সুফল বয়ে আনে না। তিনি বলেন, অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো কিছু করলে চূড়ান্ত বিবেচনায় তার কুফলই ভোগ করতে হয়। ইতিহাসের এটাই শিক্ষা।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন