পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে মাত্র চারদিনের ব্যবধানে তিনটি বড় সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দেশটির অন্তত ৩৮ জন নিরাপত্তা সদস্য ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এসব হামলার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল উত্তর বেলুচিস্তানের জিয়ারত জেলার মাঙ্গি ড্যাম এলাকায় একটি পুলিশ চৌকিতে হামলা। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় প্রথমে ৯ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। পরবর্তীতে উদ্ধার অভিযানের সময় আরও ১৮ জন অপহৃত পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেছে পাক সেনাবাহিনী। এসব হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা অভিযান চালায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। এনিয়ে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, জিয়ারত, বেলা-উইন্ডার, খারান ও দালবান্দিনে পাল্টা অভিযানে মোট ৫৪ জন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে। তবে বেলুচ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, নিহত পাকিস্তানি নিরাপত্তা সদস্যের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
মাঙ্গি ড্যামে বহুমুখী হামলা
গত ৬ই জুলাই গভীর রাতে জিয়ারত জেলার মাঙ্গি ড্যাম প্রকল্পের পাম্পিং স্টেশন নম্বর-৩ সংলগ্ন একটি পুলিশ চৌকিতে বহুমুখী হামলা চালায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভাষ্য, সশস্ত্র ‘সন্ত্রাসীরা’ বিভিন্ন দিক থেকে একযোগে হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত হামলাকারীরা পুলিশ চৌকির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এতে মাঙ্গি ও কাওয়াস থানার দুই স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও) এবং সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনীর এক হেড কনস্টেবলসহ অন্তত ৯ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন।
পাক সেনাবাহিনীর দাবি, প্রাথমিক সংঘর্ষে পুলিশ ১৫ জন ‘সন্ত্রাসীকে’ হত্যা করলেও সেনাবাহিনী ও ফ্রন্টিয়ার কোরের অতিরিক্ত বাহিনী পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা অবশিষ্ট পুলিশ সদস্যদের জিম্মি করে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায়।
পরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও ফ্রন্টিয়ার কোর ব্যাপক অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতি জিম্মি সংকটে রূপ নেয়। আইএসপিআরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী জানান, ‘সন্ত্রাসীরা’ ১৮ জন পুলিশ সদস্যকে জীবিত অবস্থায় জিম্মি করে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, জিম্মিদের জীবনের ঝুঁকির কারণে নিরাপত্তা বাহিনী ভারী অস্ত্র বা বিমান হামলা চালায়নি। তবে নিরাপত্তা বাহিনী চারদিক থেকে ঘিরে ফেললে সন্ত্রাসীরা জিম্মি করা ১৮ জন পুলিশ সদস্যকেই হত্যা করে।
শরীফ চৌধুরীর দাবি, উদ্ধার অভিযানে আরও ১১ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। ফলে জিয়ারত এলাকায় মোট ২৬ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে বলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে। এই ঘটনার পর বেলুচিস্তান সরকার জিয়ারতের পুলিশ সুপারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। একই সঙ্গে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে হামলার পুরো ঘটনাক্রম পুনর্গঠন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, কমান্ড পর্যায়ের ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল কিনা তা তদন্ত করে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।
পাক সেনাবাহিনীর কনভয়ে হামলা
জিয়ারতে অভিযান চলাকালেই বেলুচিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের লাসবেলা জেলার বেলা-উইন্ডার এলাকায় এন-২৫ মহাসড়কে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কনভয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আইএসপিআরের দাবি, বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই হামলা চালিয়েছে। এতে একজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও) ও ১০ জন সৈন্যসহ মোট ১১ জন সেনাসদস্য নিহত হন।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানায়, পাল্টা অভিযানে ১৪ জন হামলাকারী নিহত হয়েছে। অন্যদিকে বিএলএ দাবি করেছে, তাদের যোদ্ধারা ওই হামলায় ১৭ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম জব্দ করেছে।
টানা হামলায় চাপে পাকিস্তান
চারদিনের ব্যবধানে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক হামলার পর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বড় ধরনের চাপে পড়েছে। আইএসপিআরের মহাপরিচালক আহমেদ শরিফ চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে হামলাকারীদের যেখানেই থাকুক খুঁজে বের করার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে “যুক্তিসঙ্গততা ও আনুপাতিকতার” প্রশ্ন থাকবে না।
ভারত ও আফগানিস্তানের ওপর দায়
রাওয়ালপিন্ডিতে সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিআর প্রধান এসব হামলার জন্য ভারত ও আফগানিস্তানকে দায়ী করেন। তার দাবি, ভারতের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো এসব হামলার পেছনে রয়েছে এবং আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে টিটিপি সদস্যরা পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে।
তিনি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক অভিযানে নিহত অনেক জঙ্গিই আফগান নাগরিক। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
অন্যদিকে ভারত বরাবরের মতোই বেলুচ বিদ্রোহীদের সমর্থনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একইভাবে আফগান তালেবান সরকারও তাদের ভূখণ্ড পাকিস্তানবিরোধী হামলায় ব্যবহারের অভিযোগ নাকচ করেছে।
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ, সশস্ত্র হামলা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্র।
বিএলএর মতো সংগঠনগুলো একদিকে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে আসছে, অন্যদিকে জোরপূর্বক গুম, রাজনৈতিক অধিকার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বেলুচ জনগণের নিয়ন্ত্রণের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে বেসামরিক আন্দোলনও চলছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী সশস্ত্র বিদ্রোহী ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের কঠোর দমন-পীড়নের নীতি অনুসরণ করছে। বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটির নেতা মাহরাং বেলুচের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের আটকাবস্থাও সেই সমালোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক অভিযান চালিয়ে জঙ্গি দমন করাই বেলুচিস্তানের সংকটের একমাত্র সমাধান নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, জোরপূর্বক গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং স্থানীয় জনগণের অসন্তোষের মতো মূল সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে এই সহিংসতার চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
