টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এতে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, রাঙ্গামাটি ও সিরাজগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় এ মৌসুমের সর্বোচ্চ ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে জেলার নদ-নদী ও হাওরের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিতসহ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের কয়েকটি অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে নদ-নদীর পানির স্তর ক্রমাগত বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সরজমিন দেখা যায়, তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের আনোয়ারপুর ও সত্তেরখড়া এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার অংশ পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সড়কের দুই পাশে মালবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন আটকা পড়ে আছে।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জের ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ২টি ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে কমলগঞ্জের সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের ১২টি গ্রামসহ দু’টি ইউনিয়নের ২৫ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বুধবার রাত ৯টায় ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল এলাকায় ও বৃহস্পতিবার সকালে একই ইউনিয়নের গঙ্গানগরে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে দু’টি ভাঙন দেখা দেয়। এতে প্রবল বেগে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় ইসলামপুর ইউনিয়নের ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, শ্রীপুর, মোকাবিল, কোণাগাঁও, বেড়িগাঁওসহ ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে ওই এলাকার ফসলি জমি ৩-৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। পানিবন্দি মানুষজন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, টানা পাঁচদিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। দুই উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে দুই উপজেলার অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অনেক এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় অনেক গ্রামে পানি নিষ্কাশন স্থবির হয়ে পড়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ থেকে জানান, টানা ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার রাত ১২টা ১০ মিনিট থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টায় ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন জানান, নিম্নচাপের প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ প্রভাব কেটে গেলে বৃষ্টির তীব্রতাও কমে আসবে। বুধবার সকালে নগরের চরপাড়া, ক্যাডেট কলেজ এলাকা, মহিলা কলেজ, নতুন বাজার, কেওয়াটখালী, সানকিপাড়া, গোলকিবাড়ি, ধোপাখলার বাঁশবাড়ি কলোনি, পুরোহিতপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের উপর পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও ড্রেনের পানি উপচে রাস্তায় উঠে এসেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, উজানের ঢল ও দেশের অভ্যন্তরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদীর ডালিয়া ও কাউনিয়া পয়েন্টে সতর্কতা সংকেত জারি করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এদিকে, মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত রংপুর বিভাগে ৫৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টানা বৃষ্টিতে সিরাজগঞ্জ শহরের অনেক এলাকায় পানি জমেছে। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রিকশা ও ইজিবাইকচালকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গতকাল দুপুরে সরজমিন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। শহরের বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, পৌরসভা জলাবদ্ধতা নিরসনে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করেনি। পর্যাপ্ত গবেষণা ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে আজ শহরের বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনায় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলার অন্তত ৯৭টি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ২০০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
