নতুন ডিসি মু. রেজা হাসান সিলেটে যেতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। বদলির আদেশের পর অনেকটা বাধ্য হয়ে ধরেছিলেন সিলেটের পথ। পৌঁছেছিলেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডমেস্টিক টার্মিনাল অবধি। কিন্তু না, তিনি সিলেটগামী উড়োজাহাজে না উঠে ফিরে গেছেন। জানা গেছে, পূর্বের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় ফিরেছেন তিনি। তবে তার ফেরতের ঘটনায় জল্পনা-কল্পনা ডালপালা মেলছে। সূত্র বলছে, সিলেটে গিয়ে ‘অযাচিত’ বিতর্কের মুখে পড়ার শঙ্কাই তাড়া করছে রেজা হাসানকে, আর এ জন্য হয়তো তার ওই পিছু টান! জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র বলছে দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটকে বুঝবেন এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ সামলাতে পারবেন- এমন একজন যোগ্য কর্মকর্তাকে খুঁজছে সরকার।
বিশেষ করে মেধা, সততা ও নিষ্ঠার পাশাপাশি মানসিকতা ও আচরণে ‘ব্যালেন্স’ লোক খোঁজা হচ্ছে। সূত্র মতে, পরপর দুইজন ডিসি সিলেট থেকে আচমকা বদলি হওয়ায় অনেকেই এখন সিলেট বিমুখ। গত জুনে মাজারের দান বাক্সের ‘রহস্য’ বের করে সিলেট থেকে হঠাৎ বদলি হন ডিসি সরওয়ার আলম। এক বছর আগে একই ভাবে বদলি করা হয়েছিল শের মাহবুব মুরাদকে। তিনি পাথরকাণ্ডে সিলেটে বিতর্কিত হয়েছিলেন। রাজধানী ঢাকার ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে বিগত সরকারের সময় গোটা দেশে পরিচিতি পেয়েছিলেন সিলেট থেকে বদলি হয়ে যাওয়া ডিসি সরওয়ার আলম। ওই সরকারের সময় তিনি নদী দখলসহ নানা বিষয়ে সরকারের রাঘববোয়ালদের মুখোমুখি হয়েও কর্তব্য পালন থেকে বিরত থাকেননি। বরং তার কর্মকাণ্ড মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছিল। এক বছর আগে সিলেট আসার আগে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। সাদাপাথর লুটপাটের ঘটনায় ২০২৫ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে যখন সিলেটে তোলপাড় চলছে তখনই ডিসি শের মাহবুব মুরাদকে সরিয়ে নেয়া হয় মন্ত্রণালয়ে।
ডিসি শের মুরাদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠে। পাশাপাশি তার কর্তব্য অবহেলার বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসে। নতুন ডিসি হিসেবে আসেন সরওয়ার আলম। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। পর্যটন এলাকা থেকে লুট হওয়া পাথর উদ্ধারের প্রক্রিয়া চালান ডিসি সরওয়ার। এতে সফলও হন। তার ঘোষণার পর লুট করা বেশির ভাগ পাথরই ফিরিয়ে দেয় লুটেরা। সাদাপাথরে প্রতিস্থাপন করা হয় সেই পাথর। পূর্বের অবস্থায় না ফিরলেও বিরান ভূমি সাদা পাথরের সৌন্দর্য অনেকটা স্বাভাবিক হয়। বিগত সংসদ নির্বাচনে সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অঘটন ছাড়াই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। ফলে ডিসি সরওয়ার আলমকে নিয়ে সিলেটের মানুষ সন্তুষ্টই ছিলেন। হঠাৎ করে সিলেটের মাজারকাণ্ডে ফের তোলপাড় শুরু হয়।
পাথরকাণ্ডের মতো সিলেটের বার্নিং ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় মাজারকাণ্ডের ইস্যুটিও। এতে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত ছিল। তবে মাজারের টাকার স্বচ্ছ হিসাব ও ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন সবাই। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ডিসি সরওয়ার আলম মাজারের দানের টাকার তহবিলে হাত দেন। বারবারই বলেছেন; টাকা সরকার নেবে না। বরং স্বচ্ছতা রাখতে তিনি এই হিসাব চান। মাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পর তিনি মাজারের ভেতরে সব দানবাক্স নতুন করে প্রতিস্থাপন করেন। এতে তালাও ঝুলিয়ে দেন। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেন এই খাতকে। এতে তার উপর ক্ষুব্ধ হন মাজার কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ডিসির পক্ষে অবস্থান নেন কওমি অঙ্গনের আলেম-উলামারা সহ একাংশ। ফলে মাজার ইস্যুতে সিলেটের পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠে। এই অবস্থায় গত ২১শে জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণলয় এক আদেশে ডিসি সরওয়ার আলমকে সিলেট থেকে প্রত্যাহারের আদেশ জারি করেন। আর এই খবর সিলেটে পৌঁছার পর ক্ষোভ দেখা দেয়। ডিসি সরওয়ার আলমকে সিলেটে রাখতে নানা ব্যানারে আন্দোলনে নামেন একাংশের মানুষ।
অন্যদিকে নাগরিক সমাজের পক্ষে একাংশ মাজারের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানান। বিষয়টি নিয়ে তারা বিবৃতিও দেন। এরই ফাঁকে ডিসি সরওয়ার আলম জমা হওয়া মাজারের দানবাক্সের টাকাও গুনে ফেলেন। এতে দেখা যায় মাত্র চারদিনে তহবিলে জমা পড়েছে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। সঙ্গে মিলেছে ডলার, পাউন্ড, রিয়াল সহ স্বর্ণালংকার। এদিকে ডিসি সরওয়ার আলমকে বদলির পর সিলেটে যখন ক্ষোভ তুঙ্গে তখনই ২৮শে জুন আরেক প্রজ্ঞাপনে কুমিল্লার ডিসি মু. রেজা হাসানকে সিলেটের নতুন ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর ১লা জুন সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন ডিসি। কিন্তু একই প্রজ্ঞাপনে বদলি হওয়া কুমিল্লার নতুন ডিসিকে নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় ওই আদেশটি ঝুলে যায়। এতে করে সিলেটের পথ ধরেও সচিবের নির্দেশে ফের মন্ত্রণালয়ে ফিরে যেতে হয় মু. রেজা হাসানকে। ফলে সিলেটে না আসায় নতুন করে তাকে নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে- নতুন ডিসি মু. রেজা হাসানও ঘটনায় বিব্রত। তিনি আর সিলেটে আসতে চাচ্ছেন না। বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতনদের অবগত করেছেন। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে ভাবছে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে পরপর দুই ডিসি বিতর্কিত হওয়ায় এখন সিলেটে দায়িত্ব পালনে অনেক ডিসিই অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে সূত্র বলছে।
