ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। ম্যাচ শেষে চোখে অশ্রু নিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নিশ্চিত করেন, এটিই ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ। ফলে পর্তুগালের জার্সিতে তাকে আর কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি এখনও আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দিয়ে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। চলতি বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই তিনি আটটি গোল করেছেন এবং টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা দীর্ঘদিন ধরেই রোনালদো-মেসি বিতর্কে বিভক্ত। একদল মনে করেন, অসাধারণ প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও ধারাবাহিকতার কারণে মেসিই সর্বকালের সেরা (গোট)। অন্যদিকে, অনেকের মতে কঠোর পরিশ্রম ও গোল করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কারণে রোনালদোই সর্বকালের সেরা। তবে রোনালদোর বিশ্বকাপ জয় ছাড়াই ক্যারিয়ার প্রায় শেষের পথে, আর মেসির সামনে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ। এ পরিস্থিতিতে বিতর্কের ফল কি নির্ধারিত হয়ে গেছে? এনডিটিভির প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নেরই বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ক্লাব ক্যারিয়ারে কে এগিয়ে?
ক্লাব ফুটবলে গোলসংখ্যার বিচারে রোনালদো সামান্য এগিয়ে। বার্সেলোনা, পিএসজি ও ইন্টার মিয়ামির হয়ে মেসি সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে (প্রীতি ম্যাচ বাদে) ৭৯৪টি গোল করেছেন। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস ও অন্যান্য ক্লাবের হয়ে রোনালদোর গোল ৮৩০টি। তবে রোনালদো মেসির চেয়ে দুই বছরের বড় হওয়ায়, আর্জেন্টাইন তারকার সামনে এই ব্যবধান ঘোচানোর সুযোগ এখনও রয়েছে। অ্যাসিস্টের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্লাব ক্যারিয়ারে মেসির অ্যাসিস্ট ৩৫৩টি, যেখানে রোনালদোর ২২৪টি। ফলে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে মোট অবদানের হিসেবে মেসিই এগিয়ে।
ব্যক্তিগত ও দলীয় সাফল্য
ব্যক্তিগত পুরস্কারের দিক থেকেও মেসি এগিয়ে। তিনি রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। রোনালদোর ঝুলিতে রয়েছে পাঁচটি ব্যালন ডি’অর। বার্সেলোনার হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল করার পাশাপাশি মেসি জিতেছেন ১০টি লা লিগা শিরোপা। রোনালদো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসের হয়ে ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালিতে মিলিয়ে সাতটি লিগ শিরোপা জিতেছেন। তবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রোনালদো এগিয়ে। তিনি পাঁচবার এই ট্রফি জিতেছেন, যার চারটি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এবং একটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে। মেসির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা চারটি। সব ধরনের ক্লাব ট্রফি মিলিয়ে মেসির শিরোপা ৩৯টি। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি লা লিগা, দুটি লিগ ওয়ান, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, সাতটি কোপা দেল রে এবং ইন্টার মিয়ামির হয়ে একটি লিগস কাপ। রোনালদোর মোট ক্লাব শিরোপা ৩৫টি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে তুলনা
২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর মাধ্যমে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রায় সব বড় সাফল্য অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি টানা দুটি কোপা আমেরিকা এবং ২০০৮ অলিম্পিকের স্বর্ণপদকও জিতেছেন। অন্যদিকে, রোনালদো পর্তুগালকে ২০১৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৯ ও ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জিতিয়েছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মেসি ২০ গোল করে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড ভেঙেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রোনালদোর বিশ্বকাপে গোল ১১টি, যার মাত্র একটি নকআউট পর্বে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মোট গোলের হিসেবে রোনালদো এগিয়ে। পর্তুগালের হয়ে তার গোল ১৪৬টি, আর আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গোল ১২৪টি।
প্রতিবেদনের রায়
সব দিক বিবেচনায় প্রতিবেদনের মতে, স্পষ্ট বিজয়ী লিওনেল মেসি। ক্লাব ফুটবলে ব্যক্তিগত পুরস্কার, দলীয় সাফল্য, গোল ও অ্যাসিস্ট- প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি রোনালদোর চেয়ে এগিয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ বিশ্বকাপে মেসির অর্জন রোনালদোর চেয়ে অনেক বেশি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর মোট গোল বেশি, প্রতিবেদনের মতে বিশ্বকাপই দুই কিংবদন্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। যেখানে রোনালদো শিরোপা জিততে পারেননি, সেখানে মেসি বিশ্বকাপ জিতে নিজেকে সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছেন। উল্লেখ্য, এই মূল্যায়নটি প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ ও মতামত। রোনালদো বনাম মেসি বিতর্কে ফুটবলবিশ্বে ভিন্নমত রয়েছে এবং কে সর্বকালের সেরা- এ বিষয়ে কোনো সর্বজনস্বীকৃত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই।
