সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের চলমান শুনানিতে রিটকারী বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন আইনি অবস্থান তুলে ধরেছে। একপক্ষ পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণার আর্জি জানালেও, বিচারকদের জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের সংশোধনী বহাল রাখার আবেদন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরো সংশোধনী বাতিল না করে কেবল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক অংশগুলো বাতিল করা উচিত। নীতিগত বিষয়গুলো নির্ধারণের দায়িত্ব সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে রিটকারী ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কারিশমা জাহান, রেদোয়ানুল করিম ও আসিফ ইকবাল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক ও আরশাদুর রউফ। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করেছেন আদালত।
‘সংবিধানের পুনর্লিখন’ আখ্যা: শুনানি শেষে শরীফ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এটি সংবিধানের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। তার ভাষায়, এই সংশোধনীর উদ্দেশ্যই ছিল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে দুর্বল করা। তিনি বলেন, পুরো সংশোধনী বাতিলের আবেদন করা হলেও দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে পুনঃপ্রবর্তিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং ১০২ অনুচ্ছেদের সংশোধনী বহাল রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে কোনো আইনি শূন্যতা সৃষ্টি না হয়। শরীফ ভূঁইয়া বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল হলে বিচারকদের জবাবদিহির সাংবিধানিক কাঠামো বিলুপ্ত হবে। সংসদ নতুন আইন না করা পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারিক সুরক্ষায় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে পৃথক একটি মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকায় সে বিষয়ে রায় না দেয়ারও অনুরোধ জানান তিনি।
জামায়াতের অবস্থান- নীতিগত সিদ্ধান্ত সংসদের: দ্বিতীয় দিনের শুনানি শেষে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি, প্রস্তাবনা, রাষ্ট্রীয় আদর্শ বা সংবিধানের নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো আদালতের নয়, সংসদের সিদ্ধান্তের বিষয়। তার মতে, আদালত যদি এসব নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে তা সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, আদালতের উচিত কেবল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো বিচার করা। যেমন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির মাধ্যমে গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন্ন হয়েছে, তাই এ ধরনের বিধান আদালত বাতিল করতে পারে। শিশির মনির আরও বলেন, পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা হলে সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তার দাবি, এতে অতীতের কিছু বাতিল হয়ে যাওয়া সাংবিধানিক কাঠামোও কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই নীতিগত ৪১টি বিষয় সংসদের জন্য রেখে দিয়ে, কেবল মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি অংশ আদালতের বাতিল করা উচিত। তিনি আরও বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র বা রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির মতো বিষয় রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী প্রশ্ন। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংসদেই হওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিটের নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ই ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল ঘোষণা করেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি সংক্রান্ত ২০ ও ২১ ধারা, সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়। পাশাপাশি গণভোট বাতিল সংক্রান্ত ১৪২ অনুচ্ছেদের সংশোধনীও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দ্বাদশ সংশোধনীর বিধান পুনর্বহাল করা হয়। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো- গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল না করে আদালত বাকি বিষয়গুলো জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সংসদের বিবেচনার জন্য রেখে দেন। কিন্তু রিটকারীদের একাংশ ওই রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে আপিল করেন। বর্তমানে আপিল বিভাগে সেই আপিলের শুনানি চলছে।
