এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, আমাদের লড়াই হবে সেই ‘নিপীড়নের ব্যবস্থা’ ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটন করা। গতকাল সন্ধ্যায় বিটিভিতে দেয়া জাতির উদ্দেশ্যে নির্বাচনী ভাষণে তিনি একথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর গত ৫৫ বছরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্য। এরই পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুরনো কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, আইনের প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিল এবং ক্ষমতাসীনদের সংস্পর্শে পৌঁছাতে পেরেছে, তারাই শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলে নিয়েছে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিতই থেকে গেছে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক আনুগত্যই হয়ে উঠেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান শর্ত। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং বিচার ব্যবস্থাতেও প্রভাবশালীদের জন্য অবৈধ ও বিশেষ সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা রাজনীতিক, আমলা ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের একটি চক্র রাষ্ট্রীয় সম্পদ, ব্যাংক ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছে, আর সাধারণ মানুষ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সংগ্রামেই ব্যস্ত থেকেছে।
ফ্যাসিস্ট যুগে সংঘটিত গুম-খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার বিচার হবে উল্লেখ করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে খুনি হাসিনা গুম, হত্যা, বিনাবিচারে কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা করার ক্ষেত্রে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। এতে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রলীগসহ সকল অঙ্গসংগঠন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই এমন সকল সরকারি বাহিনী ও সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়েছে। তার এই অপকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান।
ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প লোপাটের অর্থ উদ্ধার ও বিচার হবে জানিয়ে নাহিদ বলেন, দেশবাসী যদি আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। লুটপাট ও অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেয়া হবে না। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়-স্বজনদের আইন ও বিচারের আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, বিদেশে পাচারকৃত এদের যে অর্থ ইতিমধ্যে শনাক্ত হয়েছে তা বাংলাদেশের কর বিভাগের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেয়া হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে জরিমানাসহ ট্যাক্স বসিয়ে দেশে থাকা তাদের সমুদয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একইসঙ্গে চিহ্নিত লুটপাটকারীদের গণশত্রু ঘোষণা করে এদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর মালিকানায় নিয়ে নেয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশাজীবীদের নিয়োগ দিয়ে দক্ষ ও স্বচ্ছ ম্যানেজমেন্ট কাঠামোর মাধ্যমে নবগঠিত এই সংস্থাটি পরিচালনা করা হবে।
নতজানু কূটনীতি থেকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, খুনি হাসিনার আমলে বাংলাদেশ একটি নতজানু পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে আবদ্ধ ছিল। দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম কার্যত ইন্ডিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো, ফলে স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট দুঃশাসন কায়েম করা ও জারি রাখার সকল পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়ন ও পরিচালিত হতো দিল্লি থেকে। বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে ফেলা, শাসন ব্যবস্থাকে গণবিরোধী করে তোলা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেয়ার সকল আয়োজন করা হয়েছে ইন্ডিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ী।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, গণপ্রতিরোধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবসমাজ সমর্থিত উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর সশস্ত্রবাহিনী গড়ে তোলা হবে। ন্যায্য বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে স্বস্তি ফেরাবো। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় দলীয় বাহিনী ভেঙে জননিরাপত্তার গণসংস্থা গড়ে তোলা হবে।
বিচার বিভাগে অন্যায়ের গোলকধাঁধাঁ ভাঙবে কীভাবে জানিয়ে এনসিপি আহ্বায়ক আরও বলেন, আর ঘুষ? আদালতের দরজায় পা রাখলেই যেন শুরু হয় অবৈধ লেনদেন। নথি নড়াতে টাকা, তারিখ পেতে টাকা, আদেশ পেতে টাকা- ঘুষের বাজারের মহা হই-হুল্লোরের মধ্যে বিচারের বাণী স্তব্ধ হয়ে গেছে! ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য বলছে, বিচার নিতে গিয়ে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। সরকারের লিগ্যাল এইড আইন অনুযায়ী গরিব ও মজলুম মানুষের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও এর কোনো সুবিধা নিচে পড়ে থাকা মানুষ পায় না। বাস্তবে বিচারক, উকিল, মোক্তার ও দালাল চক্রের এক জালে সাধারণ মানুষ আটকে যায়, দিশাহীন চক্রে ঘুরপাক খায়।
শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, কেন্দ্র ভেঙে ক্ষমতা ছড়িয়ে দেবো প্রান্তে। এ ছাড়াও ভেজাল ছাড়া কোনো খাদ্যপণ্য নাই; এই অপরাধ চলতে দেয়া হবে না। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর সংস্কৃতি ও নিজস্বতার প্রতি শ্রদ্ধা। নারী প্রশ্ন; সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চলবে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে তিনি জানান, ভবন আছে, ডাক্তার আছে, সেবা নেই। এই অচলাবস্থা ভাঙতে আমরা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চাই। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: নিবেদিত শিক্ষক ছাড়া মানসম্পন্ন শিক্ষা অসম্ভব। শিক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতির করালগ্রাসে আজ আমাদের পুরো জ্ঞান অর্জন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা হবে।
যোগাযোগ ও জনপরিবহন, নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিশৃঙ্খল খাত উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, কোনো মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চলাচলের জন্য রাস্তা বন্ধ রাখা হবে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত সড়কে সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার অগ্রগণ্য হবে। জরুরি সেবা- বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিস পাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
তিনি জানান, হাসিনার পতনের পর সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী হয়নি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা। গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল দলই রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরেই থেকেছে। কিন্তু দুর্বৃত্তপরায়ণ একটি দলের নেতা, কর্মী ও সংগঠকরা, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা চাঁদাবাজি, দখল, নিয়োগ ও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি, মিথ্যা মামলা, বিচারের রায় কেনাবেচাসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও নির্যাতনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে ব্যাপক অর্থ লোপাট করেছে। যা ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে দেশবাসী দেখেছে।
নাহিদ বলেন, এই দলটি ক্ষমতায় গেলে তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র তছনছ করে ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, জনগণ তুলনামূলকভাবে ভালো একটি পক্ষ খুঁজে তাকে ভোট দেয়ার গোপনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের বুদ্ধিদীপ্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্বপ্নবান মানুষ আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সঙ্গোপনে এই মহান কর্মটি সম্পাদন করে ফেলবেন, ইনশাআল্লাহ।
দখলমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এনসিপি’র ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ আরও বলেন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ইন্ডিয়ার আধিপত্য থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র হরণকারী ফ্যাসিবাদী শক্তির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয় থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে। চাঁদাবাজি, আধিপত্য ও দুর্নীতি থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে। স্বল্পশিক্ষিত, অযোগ্য, অসৎ, লোভী, বেপরোয়া, দুর্নীতিগ্রস্ত ও পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের প্রভাব থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে।
আমাদের লড়াই ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটন করতে
স্টাফ রিপোর্টার
৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
