জার্মানির কাছ থেকে ১২টি উচ্চ প্রযুক্তির সাবমেরিন কিনছে কানাডা, উদ্দেশ্য কি?

জার্মানির কাছ থেকে ১২টি উচ্চ প্রযুক্তির সাবমেরিন কিনছে কানাডা, উদ্দেশ্য কি?

ফন্ট সাইজ:

ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক প্রাক্কালে জার্মানির একটি কনসোর্টিয়ামকে ১২০০ কোটি ডলারের মেগা চুক্তিটি দেয়ার মাধ্যমে কানাডা কেবল তার নৌবাহিনীর আধুনিকায়নই করছে না, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরণের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক মাসের তীব্র প্রতিযোগিতার পর দক্ষিণ কোরিয়ার ‘হানভা ওশান’-কে হারিয়ে জার্মানির ‘থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস’ (টিকেএমএস) এই কাজ পেয়েছে, যা রক্ষণাবেক্ষণ খরচসহ আগামী অর্ধশতাব্দীতে ৭,০০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনির এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এল যখন দেশটির বর্তমান সাবমেরিন বহরটি প্রায় সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। ১৯৯৮ সালে বৃটেনের কাছ থেকে কেনা চারটি সেকেন্ডহ্যান্ড ‘ভিক্টোরিয়া-ক্লাস’ সাবমেরিনের তিনটিই এখন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডকইয়ার্ডে পড়ে আছে। ফলে সমুদ্রসীমা পাহারায় কানাডার এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত জরুরি এবং এটিই দেশটির ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ নতুন সাবমেরিন কেনার ঘটনা। কানাডার এই বিশাল সামরিক ব্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ লুকিয়ে আছে আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তর মেরুর বরফ গলতে শুরু করায় সেখানকার কৌশলগত সমুদ্রপথ এবং বিশাল খনিজ সম্পদের ওপর রাশিয়া ও চীনের নজর দিন দিন বাড়ছে। জার্মানির ২১২সিডি মডেলের এই সাবমেরিনগুলো মূলত অত্যাধুনিক স্টিলথ প্রযুক্তিতে তৈরি, যা প্রায় শব্দহীনভাবে পানির নিচে চলাচল করতে পারে। কানাডা এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উত্তর-পশ্চিম গিরিপথের মতো সংবেদনশীল ও বিতর্কিত রুটে শত্রুপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি মিশন চালাতে চায়। এর পাশাপাশি, ন্যাটোর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার জন্য মিত্রদের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের যে চাপ ছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে কানাডা অবশেষে সেই মাইলফলক স্পর্শ করল এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করল। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবমেরিনগুলো আকারে বড় এবং শক্তিশালী অস্ত্র বহনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও অটোয়া কেন জার্মানিকে বেছে নিল, তার নেপথ্যে রয়েছে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল।

জার্মানি ন্যাটোর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হওয়ায় তাদের সাবমেরিনগুলো মিত্র দেশগুলোর নৌবহরের সাথে নিখুঁতভাবে কাজ করতে সক্ষম, যা দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা জটিল হতো কারণ তারা ন্যাটোর সদস্য নয়। তাছাড়া, মার্কিন রাজনীতির সাম্প্রতিক ওঠানামা ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের কারণে কানাডা এখন প্রতিরক্ষার জন্য এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে ইউরোপীয় অংশীদারদের দিকে ঝুঁকছে। এই চুক্তির আওতায় জার্মানি কেবল সামরিক সরঞ্জামই দিচ্ছে না, বরং কানাডার স্থানীয় অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যাটারি উৎপাদন এবং খনি শিল্পে বড় ধরণের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দীর্ঘ ৫০ বছরের এই অংশীদারিত্ব উত্তর মেরুতে কানাডার সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতকেও দীর্ঘমেয়াদে চাঙ্গা রাখবে বলে আশা করছে দেশটি।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন