এমবাপ্পে ও প্যারাগুয়ের সিনেটরের বাকযুদ্ধ

তুমি জানোই না আমি কে

এমবাপ্পে ও প্যারাগুয়ের সিনেটরের বাকযুদ্ধ

ফন্ট সাইজ:

ফিফা বিশ্বকাপে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরেও নতুন এক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং প্যারাগুয়ের সিনেটর সেলেস্তে আমারিয়ার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের রোমাঞ্চকর ম্যাচে ফ্রান্স ১-০ গোলে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে দেয়ার পর এমবাপ্পেকে উদ্দেশ করে আমারিয়া এক পোস্টে তাকে ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতার ক্যামেরুনীয়’, ‘জোর করে নিজেকে ফরাসি হিসেবে উপস্থাপনকারী’, ‘ক্ষুব্ধ’, ‘নতুন ধনী’, ‘অহংকারী’ এবং ‘কুৎসিত’ বলে মন্তব্য করেন।

এর জবাবে এমবাপ্পে পাল্টা মন্তব্য করলে সিনেটর আমারিয়া তার এক্স অ্যাকাউন্টে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি এমবাপ্পের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা দাবি করেন এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেন। চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করেন, তার বিরোধ ফ্রান্সের সঙ্গে নয়, কেবল এমবাপ্পের সঙ্গে।

তিনি লিখেছেন, ‘সমস্যা তোমার আর আমার মধ্যে। আমি কখনও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কিছু বলিনি, বরং আমি ফ্রান্সকে ভালোবাসি। দুই বছর বয়স থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত আমি একটি ফরাসি স্কুলে পড়েছি এবং সেখানেই আমার শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। আজ আমি যা হয়েছি, তার পেছনে কলেজ দে লা ইনমাকুলে কনসেপসিয়নের অবদান রয়েছে। সেখানে আমরা ‘লা মার্সেইয়েজ’ গাইতাম এবং নিজেদের পতাকার পাশাপাশি ফ্রান্সের পতাকাকেও সম্মান করতাম। আমি ফরাসি ভাষায় কথা বলি এবং ফ্রান্সে যেতে ভালোবাসি। গত বড়দিন আমি পরিবারের সঙ্গে কুরশেভেলে কাটিয়েছি এবং নতুন বছর উদ্যাপন করেছি সাঁ-ত্রোপেজে। তাই ফ্রান্সের সঙ্গে আমার কোনো সমস্যা নেই; সমস্যা শুধু তোমার সঙ্গে।’

আমারিয়ার অভিযোগ, ম্যাচের আগে ও ম্যাচ চলাকালে এমবাপ্পে অহংকারী আচরণ করেছেন। ম্যাচটি ছিল কঠোর ট্যাকল ও খেলোয়াড়দের মধ্যে একাধিক উত্তপ্ত ঘটনার কারণে ব্যাপক আলোচিত। বিশেষ করে ম্যাচ শেষে ফ্রান্স জেতার পর এমবাপ্পে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে করমর্দন করতে অস্বীকৃতি জানান। আমারিয়া লিখেছেন, ‘ম্যাচের আগেই তোমার অহংকার আমাকে বিরক্ত করছিল। তুমি বলেছিলে, যদি আমাদের হাত নোংরা করতে হয়, তাহলে তাই করব।’ আমরা বোকা নই। আমরা বুঝেছি, তোমার কাছে ‘নোংরা’ বলতে প্যারাগুয়ের দলকেই বোঝানো হয়েছে, আর প্যারাগুয়ের দল মানেই পুরো প্যারাগুয়ে। এরপর তুমি বলেছিলে, আমাদের মেকআপ তুলে দেয়া হবে। সেটাও আমরা বুঝেছি। হয়তো তুমি মেকআপে খুবই সুন্দর দেখাও, আর আমরা গরিব ও রুক্ষ মানুষ, মেকআপ কী তাও জানি না। পুরো প্যারাগুয়ে নীরবে এসব সহ্য করেছে। আমিও করেছি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ম্যাচ চলাকালে তোমার অহংকার স্পষ্ট ছিল। তুমি প্রতিটি খেলোয়াড়কে এমনভাবে অবজ্ঞা করছিলে, যেন তারা ঘৃণ্য। এমনকি মুখও না ঢেকে তুমি বলেছিলে, ‘লা কনচা দে তু মাদ্রে’- যা লাতিন আমেরিকায় অত্যন্ত আক্রমণাত্মক গালি, আর সেটা তুমি ভালো করেই জানো।

ম্যাচ শেষে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের প্রতিও এমবাপ্পে যথাযথ সম্মান দেখাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি লিখেছেন, তুমি আমাদের গোলরক্ষকের শারীরিক অবস্থার প্রতিও কোনো গুরুত্ব দাওনি। এটা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান দেখানো প্রায় পবিত্র একটি বিষয়- যুদ্ধ হোক বা শান্তি, জয় হোক বা পরাজয়। কিন্তু তুমি তার সঙ্গে করমর্দন করোনি, বরং তার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে বিজয় উদ্যাপন করেছ। মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই তুমি তোমার অবজ্ঞা, অহংকার এবং অশোভন আচরণের পরিচয় দিয়েছ। এতে আমি যেমন কষ্ট পেয়েছি, তেমনি পুরো প্যারাগুয়েও গভীরভাবে আহত হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভদ্রতা ও মর্যাদার ঐতিহ্য বহনকারী দেশ হিসেবে ফ্রান্সের উচিত তোমার এই আচরণের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

আমারিয়া জানান, পরে তিনি নিজের আগের পোস্টটি মুছে ফেলেছেন। তিনি লিখেছেন, আমার আগের পোস্টগুলো ছিল প্রচণ্ড আবেগ থেকে লেখা। আমার শিরায় যে মিশ্র রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে- আদিবাসী ও স্প্যানিশ রক্তের সেই সুন্দর মিশ্রণের আবেগ থেকেই আমি লিখেছিলাম। তুমি যখন প্যারাগুয়ের সাহসী খেলোয়াড়দের উপহাস করলে, তখন আমি উত্তেজিত হয়ে একই ধরনের অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করি। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, আমি নিজেও তো মিশ্র জাতিসত্তা ও লাতিনা হওয়ার কারণে এমন অপমানের শিকার হই। তাই আমি পোস্টটি মুছে দিই। আমি বুঝতে পারি, আমি সেই ঘৃণারই পুনরাবৃত্তি করছি, যেটাকে আমি ঘৃণা করি। তাই আমি তা প্রত্যাহার করেছি। আমি বুঝি, এসব কথা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে, কারণ এগুলো অপমানজনক।

এরপর এমবাপ্পের কাছেও নিজের মন্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা দাবি করেন তিনি। আমারিয়া লিখেছেন, এখন আমি দাবি করছি, তুমিও তোমার বক্তব্য প্রত্যাহার করবে এবং আমার কাছে ক্ষমা চাইবে। আমিও তোমার সহিংস আচরণ মেনে নেব না। তুমি আমাকে চেনো না, তুমি জানোই না আমি কে। তাই আমাকে ঘৃণ্য নারী বা আমার পদমর্যাদার অযোগ্য বলার কোনো অধিকার তোমার নেই। আমি প্যারাগুয়ের জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সিনেটর। এর আগে আমি জনগণের ভোটে জাতীয় সংসদ সদস্যও ছিলাম। হাজার হাজার মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছেন এবং আমাকে তাদের কণ্ঠস্বর মনে করেন। আমার প্রথম দায়িত্ব প্যারাগুয়ের মানুষের হয়ে কথা বলা, তাদের নীরবতার ভাষা হওয়া এবং নিজের দেশকে জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করা। জনগণ আমার কাছ থেকে এটাই প্রত্যাশা করে।

তিনি আরও বলেন, আমি আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব করি। কারণ আমাকে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়েছে। দেশের আইন প্রণয়ন এবং জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়ার জন্যই আমি নির্বাচিত হয়েছি। নিজের দেশকে রক্ষা করার জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার অর্থ কী, সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণাই নেই। আমি জাতীয় সিনেটর- আমার দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তুমি হয়তো তা উপলব্ধিই করো না।

চিঠির শেষাংশে আমারিয়া এমবাপ্পের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অভিযোগ তোলেন এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি লিখেছেন, তুমি কে, যে আমাকে না চিনেই অযোগ্য বা ঘৃণ্য বলতে পারো? এটি স্পষ্ট লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন নারীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা। তুমি আমাকে অবজ্ঞা করছ মূলত আমি নারী বলেই। তুমি আমার গায়ের রং, ব্যক্তিগত পছন্দ, নারী পরিচয় এবং রাজনৈতিক অবস্থান- সবকিছুকেই আক্রমণ করছ। আমার সম্পর্কে দেয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করো, তোমার ফরাসি নাগরিকত্বের মর্যাদা রক্ষা করো এবং আমার কাছে ক্ষমা চাও। অন্যথায়, আমি তোমার বিরুদ্ধে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন