লড়াইটা মেসির সঙ্গে সালাহরও

লড়াইটা মেসির সঙ্গে সালাহরও

ফন্ট সাইজ:

ফুটবলে র‌্যাঙ্কিং যে একটা সংখ্যা মাত্র, তা বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করেছে কেপ ভার্দে। র‌্যাঙ্কিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে বিশ্বের এক নম্বর আর্জেন্টিনা ও দুই নম্বর স্পেন- দুই পরাশক্তির বিপক্ষেই বুক চিতিয়ে লড়েছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনাকে নকআউট পর্বে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে শুধু র‌্যাঙ্কিং দিয়ে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করা যায় না। শেষ ষোলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। তাই কোয়ার্টার ফাইনালের পথে ২৯ নম্বরে থাকা মিশরকে সামনে পেয়েও নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই আর্জেন্টিনার। কারণ তাদের দলে আছেন একজন মোহাম্মদ সালাহ। তাইতো লড়াইটা হবে মেসির সঙ্গে এই মিশরীয় তারকার।

কাগজে-কলমে এগিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরাই। কিন্তু নকআউটের ফুটবল অনেক সময় যুক্তির চেয়ে সাহস, শৃঙ্খলা আর মুহূর্তের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়। সেই বাস্তবতা ভালো করেই জানেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। শেষ ষোলোয় কেপ ভার্দের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ৩-২ গোলের জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে সেই জয় এসেছে বাড়তি পরিশ্রমের বিনিময়ে। তাই আটলান্টায় পৌঁছে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। দলের একাদশেও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। চোট কাটিয়ে ফিরতে পারেন নিকোলাস তালিয়াফিকো। মাঝ মাঠে শুরু থেকে দেখা যেতে পারে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে। আক্রমণভাগে লাউতারো মার্টিনেজের জায়গায় হুলিয়ান আলভারেজকে খেলানোর কথাও ভাবছেন স্কালোনি। মিশরের শক্তির কেন্দ্রবিন্দু অবশ্য একজনই- মোহাম্মদ সালাহ। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরা লিভারপুল ফরোয়ার্ডের গতি, ড্রিবলিং ও ফিনিশিং আর্জেন্টিনার রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাঝমাঠে মোহানাদ লাশিনের ফেরাও দলটিকে আরও ভারসাম্য দেবে। তবে আলোটা সবচেয়ে বেশি থাকবে আরেকজনের ওপর। বয়স ৩৮ হলেও লিওনেল মেসি এখনো আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রাণ। গোল করছেন, করাচ্ছেন, ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে মেসিকে থামাতে না পারলে মিশরের জন্য স্বপ্ন দেখা কঠিনই হবে।

দুই তারকার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়েছে মাত্র দুটি প্রীতি ম্যাচে। সেখানে একটি জিতেছে আর্জেন্টিনা, অন্যটি ড্র। মেসি করেছেন দুটি গোল, সালাহ অবশ্য গোলের দেখা পাননি। একসময় সালাহ বলেছিলেন, বিশ্বকাপে মেসির বিপক্ষে খেলা তার স্বপ্ন। এবার সেই স্বপ্নের মঞ্চ তৈরি হয়েছে। এই বিশ্বকাপে দু’জনই নিজেদের সেরাটা দেখাচ্ছেন। মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনেও উঠে গেছেন। অন্যদিকে সালাহর নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে উঠেছে মিশর।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারের জয়ে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বড় নায়ক। ম্যাচের আগে সালাহকে নিয়ে প্রশংসা করেছেন মেসি। স্পেনের এক সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘সালাহ বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন। আমাদের জন্য কঠিন ম্যাচ অপেক্ষা করছে।’ মিশর কোচ হোসাম হাসানও বিশ্বাস হারাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, কিন্তু ফুটবলে সবকিছুই সম্ভব। নিজেদের পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে যেকোনো দলকে হারানো যায়।’ সালাহও একই সুরে বলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে সম্মান করি। তবে আমরা নিজেদের স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নামবো। আফ্রিকার ফুটবলের জন্য নতুন ইতিহাস গড়তে চাই।’

খেলার ধরনে দু’জনের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। মেসি কেবল গোলদাতা নন, তিনি একজন অসাধারণ প্লেমেকারও। ড্রিবলিং, পাসিং, সুযোগ সৃষ্টি এবং ফিনিশিং- সবমিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সেরাদের একজন হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে, সালাহ আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল রাইট উইঙ্গার। তার গতি, নিখুঁত ফিনিশিং, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙার ক্ষমতা এবং ধারাবাহিক গোল করার দক্ষতা তাকে বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অর্জনের বিচারে মেসি বিশ্বকাপ, একাধিক চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ও লীগ শিরোপাসহ অসংখ্য দলীয় এবং ব্যক্তিগত সম্মাননা জিতেছেন। জাতীয় দলের হয়ে ২০৩ ম্যাচে ১২৪ গোল করেছেন মেসি। বিশ্বকাপে তার গোল সংখ্যা ২০। এবারের আসরে সাত। অন্যদিকে সালাহও ক্লাব ফুটবলে প্রিমিয়ার লীগ, চ্যাম্পিয়ন্স লীগসহ একাধিক বড় শিরোপা জিতে নিজের সাফল্যের ঝুলিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

জাতীয় দলের হয়ে ১২০ ম্যাচে ৬৮ গোল করেছেন সালাহর। বিশ্বকাপে তার গোল সংখ্যা ১টি। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের আলোচনায় মেসি এগিয়ে থাকলেও, আধুনিক যুগের সেরা রাইট উইঙ্গারদের তালিকায় সালাহর অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই কৌশলের পাশাপাশি ফিটনেস, বেঞ্চের শক্তি এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো কাজে লাগানোর সক্ষমতাও বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনাই এগিয়ে। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব বারবার দেখিয়েছে, ফেভারিটের পরিচয় মাঠেই প্রমাণ করতে হয়। আটলান্টার রাত তাই শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের লড়াই নয়। এটি দুই মহাদেশের ফুটবল দর্শনেরও সংঘর্ষ। একদিকে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইতিহাসের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা মিশর। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে থাকবেন দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও মোহাম্মদ সালাহ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন