ত্রিপলের ছাউনির ছোট্ট ঘরে রাতে ঘুমিয়ে ছিল একসঙ্গে। সে ঘুম ভাঙলো না তাদের। দেড় বছর আগে আরাকান আর্মির গুলি-বোমা থেকে বাঁচতে পরিবারটি বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পালিয়ে এসেছিল। এরপর ঘর বেঁধেছিল পাহাড়ের ঢালে। রোববার রাতে পাহাড় ধসের ঘটনায় বালুখালী শিবিরের সেই ঘরে প্রাণ হারান এক পরিবারের চারজনই। এ ছাড়া, কুতুপালং ও জামশিয়া ক্যাম্প এবং কক্সবাজার সদরে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় আরও পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটে।
স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার ও উখিয়া থেকে জানান, কক্সবাজার শহর ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোববার রাত একটা থেকে তিনটার মধ্যে বালুখালী, কুতুপালং ও জামশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারটি স্থানে এবং সোমবার রাত ৪ টার দিকে কক্সবাজার শহরে পৃথকভাবে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যুর বিষয়টি উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা নিশ্চিত করেছেন।
ঢালুতে বসবাসকারী অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গার মৃত্যু হচ্ছে। ক্যাম্প ১৫ এর রোহিঙ্গা মাঈন উদ্দিন বলেন, রাত দেড়টার দিকে জামতলী ক্যাম্প-১৫ এর ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ের খণ্ড ধসে রোহিঙ্গা নাগরিক কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর চাপা দেয়। এ সময় ঘুমিয়ে থাকা কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং ছেলে মোহাম্মদ আনাসের (৪) মৃত্যু হয়। গভীর রাতে ফায়ার সার্ভিস ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা মাটি সরিয়ে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেন। রাত দু’টার দিকে কুতুপালং ক্যাম্প-৭ এর ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এ সময় মো. একরাম (৭) নামে এক শিশুর মারা গেছে। সে ওই আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা রশিদ উল্লাহর ছেলে।
রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী ক্যাম্প-১১ এর সি-১১ ব্লকে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় একটি পরিবারে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং ভাই হারুনুর রশিদ (৩) ও মোহাম্মদ রিহান (৫)। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ধসের খবর পেয়ে তাঁদের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে আটজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, গভীর রাতে হঠাৎ পাহাড় ধসে পড়ায় কেউ বের হওয়ার সুযোগ পাননি। মুহূর্তের মধ্যেই ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে ঝুকিপূর্ণ স্থান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নং ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ভোররাত সাড়ে ৪টার কিছু পর ছাত্তার ঘোনায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ওই সময় পাহাড় ধসে একই পরিবারের ৩জন চাপা পড়ে। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন। এসময় আলী আকবরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, নিহতের মরদেহ সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আরও দুই দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
