স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতি পাননি বুলী ঘোষ

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতি পাননি বুলী ঘোষ

ফন্ট সাইজ:

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি বুলবুলী রানী ঘোষ (৬৯) নামের এক নারী। পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার অষ্টমণিষা গ্রামের বাসিন্দা বুলবুলী রানী ঘোষ ওরফে বুলী ঘোষ জেলার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা কুণ্ডুপাড়া গ্রামের মৃত অমূল্য চন্দ্র ঘোষের মেয়ে।

তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১৪ই মে ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ইতিহাসের এক জঘন্যতম গণহত্যা চালায় পাক হানাদার বাহিনী। ওইদিন অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয় ও অগণিত বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এলাকার মেয়েদের আটক করে দীর্ঘদিন পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আটকে রেখে নিপীড়ন চালানো হয়। অত্যাচারে অনেকেই মারা গেলেও যারা বেঁচে ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাদের ছেড়ে দেয় পাকবাহিনী। বুলবুলীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঐদিন হত্যাযজ্ঞ চালানোর একপর্যায়ে পাক হানাদার বাহিনী তার পিতামহ রাখাল ঘোষকে হত্যা করে। পরবর্তীতে পৈতৃক বাড়ি থেকে পালানোর একপর্যায়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা তাকে ধরে পার্শ্ববর্তী একটি বাগানে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে ক্যাম্পে আটকে রেখে দীর্ঘদিন অত্যাচার চালায়। সে সময় তার বয়স ছিল ১৪/১৫ বছর। স্বাধীনতার পর ক্যাম্পের বেঁচে থাকা অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে সে মুক্তি পেয়ে পৈতৃক ভিটায় বসবাস শুরু করে।

সামাজিক কারণে বিষয়টি গোপন রেখে পরিবার জনৈক প্রদীপ চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে তার বিয়ে দিলেও পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে নিঃসন্তান অবস্থায় স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেন। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনি জানান, ডেমরা এলাকায় ওই দিনের গণহত্যায় কমপক্ষে ৮০০ থেকে ১০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়। তাদের অনেকেই ঘর সংসার করছেন। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই বিষয়টি স্বীকার করেন না, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিও করেন না। তিনি যেহেতু স্বীকার করছেন, বিষয়টি অবশ্যই সত্য। বুলবুলী রানীর কাছে থাকা নথিপত্র থেকে দেখা যায়, কয়েক বছর আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনপত্রে ফরিদপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী মো. আব্দুর রাজ্জাক, ফরিদপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মঞ্জুর মোর্শেদ সেলিমসহ বুলীকে আটক করার প্রত্যক্ষদর্শী সন্তোষ কুমার কুণ্ডু ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বুলীর দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দেন ও সুপারিশ করেন।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২৪শে জুন এক চিঠিতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. নাজমুন নাহার বীরাঙ্গনা হিসেবে বুলবুলীকে গেজেটভুক্ত করার আবেদনের প্রেক্ষাপটে উপজেলা মহিলা মুক্তিযোদ্ধা (বীরাঙ্গনা) যাচাই-বাছাই কমিটিকে ঘটনাটি যাচাই-বাছাই ও সরজমিন তদন্তপূর্বক মতামতসহ কমিটির সকল সদস্যের যৌথ স্বাক্ষরে প্রতিবেদন দাখিলের অনুরোধ করেন। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা বুলবুলীকে জানানো হয়নি বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে অষ্টমণিষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুলতানা জাহান বকুল জানান, তার আবেদনের পর সংশ্লিষ্ট এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে তাকে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দেয়ার সুপারিশ করা হয়। তিনিও প্রয়োজনীয় সুপারিশ করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, নথিপত্র পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন