ব্রাজিল বনাম নরওয়ে। ম্যাচে কিছুটা ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের গন্ধও ছিল। মাঠের লড়াই শুরুর আগে ফুটবল দুনিয়ার সব আলো কেড়ে নেয় ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং ব্রুট হালান্দ বনাম আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মাগলায়েসের সেই চেনা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ম্যাচের প্রথমার্ধে গ্যাব্রিয়েল যেভাবে হালান্দকে বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারই হয়তো শেষ হাসি হাসবেন। প্রথমার্ধে নরওয়েজিয়ান গোলমেশিনের ছোঁয়া ছিল মাত্র একবার, তা-ও বক্সের ভেতর। কিন্তু হালান্দ তো অন্য ধাতুতে গড়া। ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে তার ৯০ মিনিটের আধিপত্য লাগে না, স্রেফ কয়েক সেকেন্ডের ম্যাজিকই যথেষ্ট।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচ ছিল গোলশূন্য। ঠিক তখনই মাগালায়েসকে বাতাসে পরাস্ত করে দুর্দান্ত এক হেডে নরওয়েকে এগিয়ে নেন হালান্দ। এর ঠিক ১১ মিনিট পর বক্সের বাইরে থেকে নেয়া এক নিচু ও জোরালো শটে ব্রাজিলের জালে বল জড়ান ২৫ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। ২-১ গোলের এই ঐতিহাসিক জয়ে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা নরওয়ে পৌঁছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। একই সঙ্গে ৭ গোল নিয়ে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে যৌথভাবে শীর্ষে বসে গেলেন হালান্দ।
ম্যাচ জুড়ে বল হালান্দের পা ছুঁয়েছে মাত্র ৩০ বার, পাস দিয়েছেন মোটে ১৩টি। কিন্তু কাজের কাজ যা করার, তা তিনি নিখুঁতভাবে করে দেখিয়েছেন। নিজের এই অবিশ্বাস্য পারফর্ম্যান্স এবং ম্যাচ জেতানো রূপকথা নিয়ে ম্যাচ শেষে উচ্ছ্বসিত হালান্দ বলেন, ‘নরওয়ের ইতিহাসে এটাই সর্বকালের সেরা ম্যাচ। হয়তো এই জয় নরওয়ের বুকে নতুন এক ইতিহাস লিখবে। এখন সবার এই মুহূর্তটা উপভোগ করা উচিত। নরওয়ের ইতিহাসের অন্যতম পাগলাটে একটা দিন আজ। স্রেফ আনন্দ করো, এটাকে জড়িয়ে ধরো এবং এই মুহূর্তটার স্বাদ নাও।’
এই জয় যে দেশের তরুণ প্রজন্মকে এক নতুন স্বপ্ন দেখাবে, তা মনে করিয়ে দিয়ে হালান্দ আরও বলেন ‘আমরা এই জয় নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে নরওয়ের জন্য এটি একটি বিশাল ম্যাচ ছিল। আমার বিশ্বাস, এই ম্যাচটি দেশের অনেক তরুণকে অনুপ্রাণিত করবে, ঠিক যেভাবে আমি ছোটবেলায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।’
ম্যাচজুড়ে খুব বেশি সুযোগ না পেলেও কীভাবে নিজের ফোকাস ধরে রেখেছিলেন, সেই রহস্যও উন্মোচন করলেন ম্যান সিটির এই স্ট্রাইকার। বলেন, ‘প্রতিটি ম্যাচই আলাদা। আমাদের স্রেফ একটি বা দুটি সুযোগের প্রয়োজন ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, সুযোগের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা এবং সেগুলো পাওয়া মাত্রই গোল করা। ১-০ করার হেডটা ভালো ছিল, তবে ২-০ গোলের মুহূর্তটা ছিল অবিশ্বাস্য- একদম অবিশ্বাস্য। ক্রেজি! আমাদের শুধু ফোকাসড থাকতে হতো এবং সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হতো। সাধারণত আমি প্রথম সুযোগে গোল করতে না পারলেও পরের সুযোগগুলো হাতছাড়া করি না।’
ম্যাচ শেষে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে যখন লাল পতাকার ঝড় উঠেছে, তখন সমর্থকদের সামনে গিয়ে ড্রাম বাজিয়ে সতীর্থদের নিয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’ উল্লাসে নেতৃত্ব দেন হালান্দ নিজে। মাঠের সেই বুনো উদযাপন নিয়ে তিনি বলেন, ‘নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় জয়। এটা পুরোপুরি ক্রেজি। সবকিছুই যেন চমৎকার লাগছে।’
জাতীয় দলের জার্সিতে ৫৪ ম্যাচে ৬২ গোল করা হালান্দ প্রতি ৭১ মিনিটে একটি করে গোল করছেন। নরওয়ের হয়ে শেষ ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ২৭টি! হালান্দের এমন অতিমানবীয় ফর্ম দেখে ইংলিশ কিংবদন্তি ওয়েন রুনি মন্তব্য করেছেন, ‘ও পুরো দেশটাকে বিশ্বাস করিয়েছে যে এই টুর্নামেন্টে নরওয়ে অনেক দূর যেতে পারে।’
